তোড়জোড় ফারমার্স ব্যাংক লুটেরাদের জামিন পেতে !

0
409
তোড়জোড় ফারমার্স ব্যাংক লুটেরাদের জামিন পেতে !
তোড়জোড় ফারমার্স ব্যাংক লুটেরাদের জামিন পেতে !
দেশের আর্থিক খাতের বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরে প্রায় ১৮ শ’ কোটি টাকা লুটে নেয়া ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড) অডিট ও ইসি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতী এবং তার ছেলে ব্যাংকের সাবেক শেয়ারহোল্ডার রাশেদুল হক চিশতী এই করোনা সংকটকালে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে সব মামলা থেকে জামিন পেতে তোড়জোড় শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।
অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ফারমার্স ব্যাংকের অডিট ও ইসি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতী এবং তার ছেলে রাশেদুল হক চিশতীসহ তাদের পরিবার ও স্বজনদের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলায় ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল থেকে বাবুল চিশতী ও রাশেদ চিশতী কারাগারে আটক আছেন। এরমধ্যে দুটি মামলায় দুদক চার্জশিট দাখিল করলেও বিচারে রয়েছে ধীরগতি। যার ফলে বিচারের দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা কারণ দেখিয়ে জামিনের তৎপরতা চালাচ্ছেন আসামিরা।
অভিযোগ রয়েছে, বাবুল চিশতী ও রাশেদ চিশতী ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে কৌশলে প্রায় ১৮শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এসব টাকায় কেনা স্থাবর সম্পদের বাজারমূল্য দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। আদালতের নির্দেশে এসব সম্পত্তি ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। আসামিরা জামিন পেলে জব্দ করা সম্পত্তি বেহাত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
দুর্নীতির এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা করেছে দুদক। এগুলোর মধ্যে পাঁচটি দুর্নীতি মামলা রয়েছে রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে চলমান অধস্তন ভার্চুয়াল আদালতে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে সব মামলায়ই জামিন হয়েছে এই রাশেদুল হকের।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ ধরনের রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা সব সময়ই খুব শক্তিশালী হন। করোনা পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল আদালত চালু হওয়ার পরে তারা এর সুযোগ নিয়েছেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদক এ বিষয়ে তৎপর রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি সঙ্গে যারা জড়িতরা জামিনে বের হয়ে যেতে নানা রকম চেষ্টা করছে এজন্য রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে সবসময়ই হুশিয়ার থাকতে হচ্ছে।’
২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া হয় নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংককে (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক)। অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম শুরুর পরই অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে ব্যাংকটি। পরে বাবুল চিশতী, রাশেদ চিশতীসহ সংশ্নিষ্ট কয়েকজন ব্যাংকারের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক। বাবুল চিশতীর বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
রাশেদ চিশতীর বিরুদ্ধে ঢাকায় চারটি এবং টাঙ্গাইলে একটি মামলা রয়েছে। এরমধ্যে গত ১৮ ও ১৯ মে ঢাকার চারটি মামলায় এবং ২৭ মে টাঙ্গাইলের মামলায় জামিন পান তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, টাঙ্গাইলের ভার্চুয়াল আদালত দুদকের বক্তব্য না শুনেই রাশেদ চিশতীর জামিন মঞ্জুর করেছেন। এর বিরুদ্ধে দুদক হাইকোর্টে রিভিশনও দায়ের করে। গত ২ জুন ওই জামিন বাতিল করে ফের টাঙ্গাইল আদালতে পুনঃশুনানির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া ঢাকার তিনটি মামলায় হাইকোর্ট রাশেদুল হকের জামিন বহাল রাখলেও তার বিরুদ্ধে আপিল করেছে দুদক। আগামীকাল ৯ জুন আপিল বিভাগের ভার্চুয়াল চেম্বার আদালতে এ বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইলে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আকবর আলী খান বলেন, টাঙ্গাইলে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রাশেদ চিশতীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় গত ২৭ মে রাষ্ট্রপক্ষে আমি জামিনের বিরোধিতা করি। কিন্তু আদালত তাকে জামিন দিয়েছিলেন। অবশ্য হাইকোর্ট ওই জামিন বাতিল করে দুদকের উপস্থিতিতে ফের শুনানির জন্য টাঙ্গাইল আদালতকে নির্দেশ দিয়েছেন।
দুদকের আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান বলেন, দুদক থেকে প্রতিটি মামলায় হাইকোর্টে আপিল করা হয়েছে। যার মধ্যে টাঙ্গাইলে মামলায় তার জামিন স্থগিত করা হয়েছে। অপর একটি মামলায় আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত তার জামিন স্থগিত রয়েছে। অপর তিনটি মামলায় দুদক এরই মধ্যে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘অর্থপাচার মামলাগুলো এমনিতেই অত্যন্ত সেনসিটিভ। তারমধ্যে ব্যাংকখাতের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা হলো ফারমার্স ব্যাংকের দুর্নীতি। এই ব্যাংকে এতটাই দুর্নীতি হয়েছে যে, গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে সরকারকে ব্যাংকটির নামই পরিবর্তন করতে হয়েছে। যেটি এখন পদ্মা ব্যাংক নামে পরিচিত। শুধু তাই নয় ব্যাংকটিকে সচল রাখতে সরকার পরবর্তীতে বিভিন্নখাত থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে তহবিলেরও জোগান দিয়েছে । আর ব্যাংকের এই দুরাবস্থার জন্য যারা দায়ী তারা যদি মামলার এ পর্যায়ে জামিন নিয়ে বের হয়ে যায়, সেটি হবে দুঃখজনক।  দুদক এ ক্ষেত্রে বসে থাকতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংক কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা রাশেদ চিশতী তার বিরুদ্ধে থাকা ৫টি মামলাতেই নিম্ন আদালত থেকে জামিন পেয়েছিলেন। ভার্চুয়াল আদালতের ফাঁকফোকরে তার জামিন হয়েছিল। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মামলায় আদালত দুদকের বক্তব্য না শুনেই রশিদ চিশতিকে জামিন দেওয়া হয়েছিল। তবে দুদক থেকে প্রতিটি মামলায় হাইকোর্টে আপিল করা হয়েছে়। যারমধ্যে  ইতিমধ্যে টাঙ্গাইলে মামলায় তার জামিন স্থগিত করেছে। অপর একটি মামলায় আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত তার জামিন স্থগিত রয়েছে। আর অপর তিনটি মামলায় শর্তসাপেক্ষে জামিন হাইকোর্টে বহাল রাখা হলেও দুদক এরই মধ্যে  আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেছে। আশা করছি দুর্নীতির এত বড় মামলায় আসামিরা কোন অবস্থাতে বের হয়ে যেতে পারবে না। আমরা আইনগতভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করবো।’
রাশেদ চিশতির মামলাটি উচ্চ আদালতে সিরাজুল হক এসোসিয়েটসের চেম্বার থেকে পরিচালনা করা হচ্ছে। মামলার ফাইলিং আইনজীবী শাহরিয়ার কবির বিপ্লব বলেন, ‘রাশেদ চিশতি কোন অপরাধ করেননি। তারপরেও তার বিরুদ্ধে ৫টি মামলা হয়েছে। এ সব মামলায় যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা সম্পুর্ন ভিত্তিহীন। কারণ তার বিরুদ্ধে যেসব অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ২০১৩ সাল থেকেই তার সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে ।
ব্যাংকখাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জামিন প্রসঙ্গে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ফারমার্স ব্যাংকটি কিছু লোক দুর্নীতি করে ডুবিয়েছে। ব্যাংকখাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে এসব  দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা উচিত। রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করাই তাদের নৈতিক দায়িত্ব। আশা করছি তারা এ ব্যাপারে তৎপর থাকবেন।
দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসামিরা বিত্তশালী। করোনা পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল আদালতের সীমাবদ্ধতাকে তারা কাজে লাগিয়েছে। দুদকেরপক্ষ থেকে ইতিমধ্যে রাশেদুল হকের জামিন বাতিলে সব ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংককে (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক)। অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম শুরুর পরই অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে ব্যাংকটি।
আস্থার সংকট তৈরি হলে আমানতকারীদের অর্থ তোলার চাপ বাড়ে। পরিস্থিতির অবনতি হলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতি । পরিচালকের পদ থেকেও পদত্যাগ করেন তারা। পরে বাবুল চিশতি ও রাশেদ চিশতিসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যাংকারের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক। অবশ্য কোনো মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে আসামি করা হয়নি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY