‘ইনশাআল্লাহ’র তাৎপর্য বঙ্গবন্ধুর ভাষণে

0
94

মহানবীকে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার নির্দেশ : পবিত্র কোরআনের সুরা কাহফে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। ইহুদিরা একবার মক্কার কাফিরদের শিখিয়ে দিল, তোমরা মুহাম্মদের কাছে যাও এবং তাকে প্রশ্ন করো, সে আসহাবে কাহফ সম্পর্কে কিছু জানে কি না। কাফিররা মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আপনি আমাদের আসহাবে কাহফ সম্পর্কে বলুন। মুহাম্মদ (সা.) তাদের বলে দিলেন, তোমরা আগামীকাল আসো, আমি তোমাদের আসহাবে কাহফ সম্পর্কে বলব। পরদিন কাফিররা এলো, কিন্তু নবী (সা.) আসহাবে কাহফ সম্পর্কে কিছু বলতে পারলেন না। এই না বলতে পারা ১৫ দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই ১৫ দিন জিবরাইল (আ.) মহানবী (সা.)-এর কাছে আসেননি। ফলে ওহি আসাও বন্ধ ছিল। ১৫ দিন পর জিবরাইল (আ.) এলেন। তিনি এই মর্মে ওহি ব্যক্ত করেন, ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলে, আপনি কখনো কোনো কাজের বিষয়ে বলবেন না যে ‘আমি ওটা আগামীকাল করব।’ যদি ভুলে যান, তাহলে আপনার পালনকর্তাকে স্মরণ করবেন…। (সুরা : কাহফ, আয়াত : ২৩ ও ২৪)

সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাধীন : ১৫ দিন পর এভাবে মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে আল্লাহ তাআলার সংযোগ ঘটে। মহানবী (সা.) খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। সময়মতো জবাব দিতে না পারায় কাফির ও মুশরিকরা মহানবী (সা.)-কে নিয়ে হাসিঠাট্টা ও বিদ্রূপ-উপহাস করা শুরু করে দিয়েছিল। ১৫ দিন পর প্রশ্নের জবাবও আসে, পাশাপাশি নবী (সা.) এবং তাঁর  উম্মতদের জন্য এ নির্দেশনা দেওয়া হয় যে প্রত্যেক কাজ আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। মুফতি শফি (রহ.) তাঁর তাফসিরে এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার কথা বললে এভাবে বলা দরকার : যদি আল্লাহ চান, তাহলে আমি এ কাজটি আগামীকাল করব। ইনশাআল্লাহ বাক্যের অর্থ তা-ই। [পবিত্র কোরআনুল কারিম, মুফতি শফি (রহ.)-এর তাফসির, মদিনা মুনাওয়ারা, ১৪১৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ৮০৫]।

মুফতি শফি (রহ.) এ বিষয়ে আরো ফতোয়া দিয়েছেন যে ভবিষ্যৎ কাজের ক্ষেত্রে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা মুস্তাহাব। ভুলক্রমে যদি বাক্যটি বলা না হয়ে থাকে, তবে যখনই স্মরণ হবে, তখনই তা পড়ে নিতে হবে। [মুফতি শফি (রহ.) : পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৮০৫-৮০৬]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ‘ইনশাআল্লাহ’ : বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুুক্তিযুদ্ধ সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা। পাকিস্তানিরা যখন বাঙালিদের ওপর এক অন্যায় সমর চাপিয়ে দিল, তখন যুদ্ধ ছাড়া এ দেশের মানুষের কাছে বিকল্প আর কিছু ছিল না। সেদিনের সমরনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চ, ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ভাষণে সে বিকল্পের সমাধান ঘটে। বঙ্গবন্ধু সেদিন তেজোদীপ্ত কণ্ঠে জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘মনে রাখবা—রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। (ভাষণের টেক্সট—শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা-২০১২, পৃষ্ঠা ২৫৫)

ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে ‘ইনশাআল্লাহ’র প্রভাব : যাঁরা ধর্মনিষ্ঠ, তাঁরা মনে করেন, ভাষণের ওই একটি শব্দ, ‘ইনশাআল্লাহ’ সমগ্র দৃশ্যপটকে পরিবর্তন করে দেয়। কারণ পাকিস্তানিরা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল শুধু ইসলামের নামে। তাদের বিরোধিতাকে তারা ইসলামের বিরোধিতা বলে প্রচার করত। তাদের প্রপাগান্ডা এতটা শক্তিশালী ছিল যে পাকিস্তান, পাকিস্তানের শাসক মিলিটারি জান্তা এবং ইসলাম এক হয়ে গিয়েছিল। ধর্মপ্রাণ মানুষ মনে করত, যা-ই হোক, ইসলামের জন্যই পাকিস্তান টিকে থাকা দরকার। পাকিস্তানি পাঞ্জাবি শাসকরা যে শাসনক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই ইসলামের ধুয়া তুলছে, তা তলিয়ে দেখতে পারেনি সাধারণ মানুষ। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান আসেনি, যার লেবাস ইসলামী অথবা মুখমণ্ডলে ইসলামী শরিয়াহর চিহ্ন ছিল, এখনো নেই। এটা ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র, অথচ তার শাসক নেতারা পাশ্চাত্য খ্রিস্টীয় রীতিনীতি, মদ-জুয়া ও নারীতে অভ্যস্ত ছিল। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। আল্লাহ তাআলা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে সে কাজটি করে দিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন ৭ই মার্চ ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে ফেললেন, তখন সব সংশয় দূর হয়ে গেল।

একজন আলেম এ লেখককে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁরা যখন মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন, তখন তাঁদের ওস্তাদদের ১৯৭১ সালের এ ঘটনাবহুল দিনগুলোতে খুবই চিন্তিত ও বিমর্ষ দেখতেন। ইসলামের সুরক্ষার জন্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তানিদের জুলুম, নির্যাতন ও গোঁয়ার্তুমির জন্য সে পাকিস্তান ভাঙতে বসেছে। এমন অবস্থায় যখন ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা’, তখন সব সংশয় দূর হয়ে গিয়েছিল। বোঝা গিয়েছিল, বঙ্গবন্ধু এ কঠিন সময়ে আল্লাহর সাহায্য চাচ্ছেন। তাই বাঙালিদের জন্য পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ সহজ হয়ে গিয়েছিল। (সাক্ষাৎকার : মাওলানা সোলায়মান, ইমাম, শাহবাগ চাঁদ মসজিদ, ঢাকা)

ইসলামের ইতিহাসে ইনশাআল্লাহ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সব উম্মতের জন্যও তা জরুরি। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু সে জরুরি কাজটি করেছিলেন। ফলে বাঙালিদের শুধু বিজয়ই ঘটেনি, বিজয়টি এত দ্রুত ঘটেছিল যে বিশ্বের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ছিল এটি একটি বিরল ঘটনা। মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ইনশাআল্লাহর ফজিলত এমনই বরকতময় হয়ে উঠেছিল।

লেখক : সাবেক উপপ্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদপ্তর

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY