ওসমান পরিবারের প্রয়াত ৩ সদস্যের নামে সেতু-মহাসড়ক

0
85
ওসমান পরিবারের প্রয়াত ৩ সদস্যের নামে সেতু-মহাসড়ক

নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের ৩ প্রয়াত সদস্যের নামে শীতলক্ষ্যা সেতুসহ ২টি আঞ্চলিক মহাসড়কের নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

গত ২৫ মে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের আওতাধীন মদনপুর-মদনগঞ্জ-সৈয়দুপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে নির্মাণাধীন ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতুটির নাম ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম নাসিম ওসমান সেতু’, ঢাকা-সাইনবোর্ড-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের সাইনবোর্ড (লিংক রোড) থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কটি স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত (মরণোত্তর) ভাষাসৈনিক ‘একেএম সামসুজ্জোহা সড়ক’ এবং নারায়ণগঞ্জের খানপুর থেকে হাজীগঞ্জ হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ ইপিজেড পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কটি ভাষাসৈনিক ‘বেগম নাগিনা জোহা সড়ক’ নামকরণ করা হয়েছে।

এদিকে সরকারের এ ঘোষণায় আনন্দের বন্যা বইছে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

তারা বলছেন, দেশের সব স্বাধিকার-স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা পালনকারী এই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের প্রয়াত তিন সদস্যের নামে নারায়ণগঞ্জবাসীর তিন যুগের প্রাণের দাবি শীতলক্ষ্যা সেতুসহ ২টি মহাসড়কের নামকরণ করে নারায়ণগঞ্জবাসীকেই সম্মানিত করা হয়েছে।

এদিকে শুক্রবার বাদ জুমা এ খবরে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন মসজিদে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অপরদিকে বিষয়টি নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে একটি মাইলফলক বলে আখ্যা দিয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক জেলা কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সরকার, মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক সদিচ্ছায় শীতলক্ষ্যা সেতুসহ ২টি মহাসড়কের নাম এমন তিনজন ব্যক্তির নামে নামকরণ করা হলো- যারা দেশের ও নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন। আমরা সব মুক্তিযোদ্ধার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ের ভূমিকা তুলে ধরে ২০১৪ সালের সংসদ অধিবেশনে ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন- ৭৫ পরবর্তী সময়ে ভারতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের যে অল্প কয়েকজন খোঁজখবর নিতেন তাদের মধ্যে ছিলেন প্রয়াত সামসুজ্জোহা ও তার স্ত্রী নাগিনা জোহা। বঙ্গবন্ধু পরিবারকে মুক্ত করতে প্রয়াত সামসুজ্জোহার গুলি খাওয়া, ৭৫-এর পরে নববধূকে রেখে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রয়াত নাসিম ওসমানের প্রতিরোধ যুদ্ধে যাওয়ার স্মৃতিচারণও করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আজ সেই তিনজন ব্যক্তিকে সম্মান দেখিয়ে বর্তমান সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী মূলত নারায়ণগঞ্জবাসীকেই সম্মানিত করেছেন। নারায়ণগঞ্জের সব ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা তাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি খন্দকার শাহ আলম জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মমত্ববোধ বরাবরই ছিল এবং আছে। প্রাণের দাবি শীতলক্ষ্যা সেতুটি নির্মাণের কারণে লক্ষ্যাপাড়ের এপার-ওপার সংযুক্ত হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে লিংক রোডটি প্রশস্ত করা ও খানপুর থেকে ইপিজেড পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের যোগাযোগ ও উন্নয়নে মাইলফলক। আমরা জেলাবাসী ও সব প্রেস কমিউনিটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান সরকারকে সাধুবাদ জানাই।

বিষয়টি নিয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মহসিন মিয়া জানান, ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবার শুধু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সাথেই নয়, নারায়ণগঞ্জের আপামর মানুষের আস্থার জায়গাটিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনপুরুষ ধরে পরিবারটি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে তারা জনগণের হৃদস্পন্দন বুঝতে পারেন। যেটি প্রধানমন্ত্রীও অনুভব করেন এবং করেন বলেই তিনি নারায়ণগঞ্জবাসীকে সম্মানিত করেছেন, কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে উন্নয়ন ও সম্মান জানানোর যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলেন তা শুধু তার দ্বারাই সম্ভব। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

জানা গেছে, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক একেএম সামসুজ্জোহা ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম বাংলাদেশ বেতারে ভাষণ প্রদান করেন এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) প্রথম বাঙালি হিসেবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন ঢাকা-৩০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যার সময় তিনি শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সাথে একই সেলে বন্দি ছিলেন। এছড়াও তার স্ত্রী বেগম নাগিনা জোহা ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক। ভাষা আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার বড়ছেলে প্রয়াত নাসিম ওসমান ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আপাদমস্তক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি শুধু মুক্তিযুদ্ধই করেননি, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে অংশ নিয়েছিলেন প্রতিরোধ যুদ্ধেও।

আশির দশকের শুরুতে নাসিম ওসমান যোগ দেন এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে। তিনি আমৃত্যু জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।

তিনি যথাক্রমে ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে মোট ৪ বার জাতীয় পার্টি ও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর ও বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY