কবরী রোড

0
27

নায়িকা কবরী এসেছিলেন চুয়াডাঙ্গায়। সেই থেকে ৪০০ মিটার দীর্ঘ একটি রাস্তার নাম কবরী রোড। ১৯৬৯ সাল। চুয়াডাঙ্গার মানুষ ভোলেনি আজও। সেতাব মঞ্জিল নামের বাড়িটিতে আছে কবরী মেসও। আলমডাঙ্গা থেকে মাঝেমধ্যে কবরী রোড বেড়াতে যান রহমান মুকুল

কবরী রোড এখন এমন। ছবি : সংগ্রহ

হয়েছিল কী, নারায়ণ ঘোষ মিতা একটি ছবি বানাচ্ছেন। সেই ছবির চিত্রগ্রাহক বেবী ইসলাম। তাঁর সহকারী তোকা মিয়া। দুজনে আবার কাজিন। দুজনেরই বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। তোকা মিয়ার চুয়াডাঙ্গা শহরের বাড়িটায় শুটিং হবে ছবির। ছবিটির নাম ‘ক খ গ ঘ ঙ’। ছবির নায়িকা কবরী আর নায়ক রাজ্জাক। মিনা নামের মেয়েটি কবরী নাম পেয়েছে ঢাকায় এসে। ঢাকা শহরে এসেছে সে বছর ছয় হয়। বয়স তখন কত আর—আঠারো বা উনিশ। এর মধ্যেই নাম রওশন করেছে সারা দেশে। মিষ্টি মেয়ে, পাশের বাড়ির মেয়ে ইত্যাদি কত নামে ডাকে কবরীকে দেশের লোক। রুপালি পর্দার মানুষরা দেশের মানুষের স্বপ্নলোকে থাকে। অথচ এই মেয়েটাকে খুব আপন মনে হয়। মনে হয় ব্যাপারি বাড়ির শাহানা নয়তো রঞ্জিত কাকার নাতনি শম্পা। এই মেয়েটা গেল চুয়াডাঙ্গায়। মাস ধরে থাকবে। বার্তা রটে গেল ক্রমে। এদিক-ওদিক-সেদিক থেকে লোকজন এলো। বেবী ইসলামের স্ত্রী তন্দ্রা ইসলামও ওই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যাচ্ছে, কবরী তখন ভালোই জনপ্রিয়। অনেক লোক দেখতে আসত।

ছবিটি যেমন
যুদ্ধের দিনগুলোয় যাঁরা যুবক ছিলেন, তাঁদের অনেকেই ‘ক খ গ ঘ ঙ’ দেখে থাকবেন। দারুণ এক সরল সামাজিক ছবি। এর কাহিনি লিখেছেন কাজি আজিজ, এ টি এম শামসুজ্জামান, বেবী ইসলাম ও সৈয়দ শামসুল হক। আর চিত্রনাট্য লিখেছেন বেবী ইসলাম। সংলাপ লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। ছবিটি প্রযোজনা করেন রাজ্জাক, কবরী, বেবী ইসলাম ও নারায়ণ ঘোষ মিতা। ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন আলতাফ মাহমুদ। গান লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ফেরদৌসী রহমান, সাবিনা ইয়াসমিন, আব্দুল জব্বার, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী ও আলতাফ মাহমুদ। এই ছবিটিকেই প্রথম ব্যবসা সফল সামাজিক বাংলা চলচ্চিত্র ধরা হয়।

চুয়াডাঙ্গার দিন
এখনকার ছেলে-মেয়েদের তো সময়ই নেই। অন্তত সরল সামাজিক ছবি দেখার। আর সিনেমা হলও যে খুব বেশি চালু আছে তা-ও নয়। অথচ একটা সময় ছিল যখন সিনেমা দেখাই ছিল বিনোদনের সেরা উপায়। তাইতো বয়স্করা আজও কবরী রোডে গিয়ে পড়লে আবেগে আপ্লুত হয়ে যান। চলে যান স্মৃতির বাড়ি। শহরতলির বাসিন্দা শামসুল হক যেমন বললেন, ‘এ সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় এখনো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে কুটনি বুড়িকে নিয়ে মেঠো পথে নায়করাজের গরুর গাড়ি হাঁকিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরার ছবিও ভুলিনি। কবরীর মতো দুষ্টুমি করার তো চলই হয়ে গিয়েছিল।’

কবরী রোড এখন
সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার স্থানীয় সংসদ সদস্য। কবরী রোডেই তাঁর বাড়ি। সড়কটি পৌর ভবন ও সরকারি কলেজের সংযোজক। এ রোডে আরো আছে বন বিভাগের নার্সারি, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বেশ কিছু অফিস। স্থানীয় নামকরা কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও আছে। উনসত্তরে কবরী থেকেছিলেন মোরশেদ আহমেদের বাড়িতে। এলাকার লোক তাঁকে ডাকে তোকা মিয়া বলে। তোকা মিয়ার বাড়িটায় তখন প্রতিদিনই ভিড় জমত। রিকশাওয়ালাদের কাছে দূরের লোক জানতে চাইত, কবরী কোন বাড়িটায় আছেন? রিকশাওয়ালারা তখন হয়তো বলে থাকবে, ‘চলেন নিয়ে যাই কবরী রোডে।’ পয়সা কমাতেই কিন্তু শুটিংয়ের জন্য চুয়াডাঙ্গা নির্বাচন করা হয়। তন্দ্রা ইসলামের স্মৃতিচারণা থেকেই জানা যাচ্ছে, ছবির বাজেট নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। বেবী ইসলাম বলেছিলেন, ‘সেটের পয়সা লাগবে না, চুয়াডাঙ্গায় শুটিং হবে।’ সেভাবেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

সেসব স্মৃতিচিহ্ন
যে গরুর গাড়িটি নায়করাজ সিনেমার শুটিংয়ে হাঁকিয়েছিলেন তার মালিক ছিলেন জাফরপুরের হিরু মিয়া। অনেক আগেই তিনি মারা গেছেন। এরপর যে পুকুরটিতে ছিপ ফেলে নায়করাজ মাছ ধরতে ব্যস্ত ছিলেন, সেটি সাতগাড়িতে। এই পুকুরপারেই কবরীর সঙ্গে রাজ্জাকের দুষ্টু-মিষ্টি প্রেম হয়েছিল। এখনো এটিকে তালপুকুর ডাকে লোকে। পুকুরটির এখনকার মালিক হোসেন আলী। তিনি জানিয়েছেন, এখন এই পুকুরের চারধারে অনেক তালগাছ ছিল। সে কারণেই এর নাম হয়েছিল তালপুকুর। তোকা মিয়ার একতলা বাড়িটার নাম সেতাব মঞ্জিলের। বাড়িটার দেয়ালে লেখা ‘কবরী মেস’। যেখানে নানা জায়গার অনেক লোক একসঙ্গে থাকে ও খায় সেটাই মেস। কবরী মেসের একটা ঘরে গিয়ে একজন তরুণকে পেলাম। বললেন, ‘আমি আগে থেকেই জানতাম, এখানে একটি সিনেমার শুটিং হয়েছে।’ পরে ইউটিউবে আমি ছবিটিও দেখেছি। বাড়ির গেটে রুবেল নামের একজনের সঙ্গে দেখা হলো। রুবেল এলেন মেসে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। স্থানীয় এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তিনি। রুবেল জানতেন না, এ বাড়িতে একটি ছবি হয়েছে। তবে সুবিধা হলো এই বাড়িটা শহরের সবাই চেনে। চেনাতে কষ্ট হয় না।

kalerkantho

কবরী বলেছিলেন
‘‘মনিপুরীপাড়ায় আমরা মিটিং করলাম। আমি, রাজ্জাক, আনোয়ার হোসেন, নারায়ণ ঘোষ ও বেবী ইসলাম ছিলাম। সিদ্ধান্ত হলো, আমরা অভিনয়ের জন্য কোনো সম্মানী নেব না। সবাই প্রডিউসার (প্রযোজক) হব। কিন্তু শেষে এসে রাজ্জাক সাহেব রাজি হলেন না। পরে হাসমতকে (হাবা হাসমত) নেওয়া হলো প্রডিউসার হিসেবে। ছবিটা অনেক ব্যবসা সফল হয়েছিল। যে বাড়িতে শুটিং হয়েছিল, সেটি ছিল বেবী ইসলামের মামার বাড়ি। এক মাস ধরে চলল শুটিং। আমি তখন ছোট; বয়স কম। শহরটিও ছোট্ট। তবু মানুষজনের যেন কমতি ছিল না। এক দিন তো শুটিংয়ের সময় আর লোকজনকে সরানো যাচ্ছিল না। কাজই করা যাচ্ছিল না। শেষে আনোয়ার হোসেন সাহেব খেপে গেলেন। সামনে গিয়ে বললেন, ‘তোমরা যদি এখনই সরে না যাও, তাহলে আমি কিন্তু কাপড় ফেলে দৌড় দেব।’ ভয়ংকর কথা! কিন্তু তাতে কী! লোকজন যেন আরো মজা পেল। আসলে আমরা তো খুব সাদামাটাভাবেই সেখানে ছিলাম। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেছি। মাটিতে বসে গল্প করেছি। শুটিংয়ে সবার সঙ্গে টিনের থালায় খেয়েছি। এক মাস পর শুটিং শেষে ফিরে আসার সময় তো আমার মন খুবই খারাপ হয়ে গেল। লোকজনকে বলেছি, আমি আবার আসব। কিন্তু এত বছর হয়ে গেল। আর তো যেতে পারিনি।’’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY