করোনার নতুন ধরন

0
55

করোনাভাইরাসের নতুন একটি রূপ ধরা পড়ে গত মার্চ মাসে। সম্পূর্ণ নতুন হওয়ায় এবং ভাইরাসটি সম্পর্কে আগে কোনো ধারণা না থাকায় তা আলোচনায় আসেনি। তবে সম্প্রতি ডেনমার্ক ও নরওয়ের রোগীদের দেহে এ ধরনের ভাইরাসের উপস্থিতি গবেষকদের দৃষ্টিগোচর হয় এবং তাঁরা নড়েচড়ে বসেন। নতুন এই ভাইরাসটির উত্পত্তিস্থল এবং সংক্রমণের বিস্তারভেদে এর নাম দেওয়া হয় ‘দি ইন্ডিয়ান ডাবল মিউটেশন’। এ পর্যন্ত ডেনমার্কে ১১ জন, নরওয়েতে একজন, যুক্তরাজ্যে ৭৩ জন এবং স্কটল্যান্ডে চারজন রোগীর ব্যাপারে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে, এদের দেহে ইন্ডিয়ান ডাবল মিউটেশন কভিড-১৯-এর অস্তিত্ব রয়েছে। তবে সুইডেনে এখনো এই ভাইরাসের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

ভারতে হঠাত্ করেই এবং অতি দ্রুততার সঙ্গে কভিড-১৯ ছড়ানোর জন্য এই নতুন ধরনের করোনাভাইরাসকেই দায়ী করছেন গবেষকরা। নতুন ধরনের এই করোনাভাইরাসের উত্পত্তি খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় যে গত মার্চ মাসেই এর অস্তিত্ব প্রথম ধরা পড়ে। তবে যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ-আফ্রিকান করোনাভাইরাস টাইপের ডামাডোলে এটি তেমন আলোচনায় আসেনি এবং গবেষকরাও বিষয়টি আলাদাভাবে দেখার সুযোগ পাননি। জরিপে দেখা যায়, যাদের দেহে ‘দি ইন্ডিয়ান ডাবল মিউটেশন’ এর অস্তিত্ব ধরা পড়েছে, তারা প্রত্যেকেই পরস্পরের কোনো না কোনোভাবে পরিচিত এবং যে দেশে (ভারতে) ভাইরাসটি সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত করছে, সে দেশের সঙ্গেও তাদের যোগসূত্র ছিল। ভাইরাসটি তাদের মধ্যেও সংক্রমিত হতে সক্ষম বলে মনে করা হচ্ছে, যাদের এরই মধ্যে কভিড-১৯-এর টিকা দেওয়া হয়েছে বা এরই মধ্যে যাদের একবার কভিড-১৯ হয়েছে।

অন্যান্য ভাইরাসের মতো করোনাভাইরাসও এক ব্যক্তির দেহ থেকে অন্য ব্যক্তির দেহে যেতে যেতে খুব স্বল্প মাত্রায় পরিবর্তিত হতে থাকে। এই রূপান্তরগুলোর বেশির ভাগই ভাইরাসের আচরণের পদ্ধতিগত রূপের কোনো পরিবর্তন করে না। তবে কিছু মিউটেশন বা রূপের পরিবর্তন স্পাইক প্রোটিনের পরিবর্তনের সূত্রপাত করে, যা ভাইরাসটি মানবদেহের কোষগুলোতে সহজে প্রবেশ করতে ব্যবহূত হয়। পরিবর্তিত এই রূপগুলো সম্ভবত আরো ভয়াবহভাবে সংক্রামক হতে পারে এবং রোগী আরো গুরুতর অসুস্থ হতে পারে বা দেহে প্রয়োগকৃত ভ্যাকসিনের প্রটেকশনকে ফাঁকি দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে দেহে প্রবেশ করতে পারে। সার্স-কোভ-২-এর মতো কভিড-১৯-এর শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে ব্যবহূত টিকাগুলো মানবদেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করে দেহকে সুরক্ষা দেয়। দেহের সুরক্ষার জন্য ‘নিরপেক্ষ অ্যান্টিবডি’গুলোর কারণে ভাইরাস দেহকোষে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়।

সুইডেনের সেরাম ইনস্টিটিউটের ভাইরাস গবেষক এবং প্রধান চিকিত্সক অ্যান্ডারস ফমসগার্ড বলেন, ডেনমার্কে সংক্রমিত ১১ জন রোগীর দেহে পাওয়া ভাইরাসের যে চেইন তার মধ্যে কোনো ভিন্নতা পাওয়া যায়নি, যা গবেষকদের আশ্বস্ত করছে। ভিন্নতা পাওয়া গেলে হয়ত এর নিরাময়ের ব্যাপারে জটিলতার সৃষ্টি হতো। ফমসগার্ড আরো বলেন, ডেনমার্কে ভাইরাসের কোন রূপগুলো বেশি ধরা পড়েছে, তা দেখার জন্য অধিকতর পরীক্ষা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বোঝা যাবে, একটি দেশে ভাইরাসের কোন রূপটি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে এবং তখন তা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সহজ হবে। উল্লেখ্য, এ মুহূর্তে করোনার ব্রিটিশ রূপটি ডেনমার্কে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রায় ৯৬ শতাংশের মতো। তবে আলোচিত ‘ইন্ডিয়ান ডাবল মিউটেশন’ ভাইরাসটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে এটা অধিকতর সংক্রামক বা মারাত্মক কি না, গবেষণায় তা এখনো স্পষ্ট নয়। ‘এটি নিয়ে বেশি শঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই, তবে আমাদের অবশ্যই এটিকে আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখে উচিত’ বলে মন্তব্য করেন সুইডেনের করোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক আলী মীরাজামী। ভারতীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক বিবৃতিতে জানানো হয় যে ‘ডাবল মিউটেশন’ ভাইরাসটি দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে দেহে প্রবেশ করতে পারে এবং এতে সহজেই মানুষের দেহে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। নরওয়েজিয়ান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র এস্পেন রোস্টরপ নাকস্তাদ বলেছেন, “টিকা নেওয়ার পরও ‘ভারতীয় ডাবল মিউটেশন’ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন যে কেউ।”

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY