ছোট্ট ফাহিমের অর্থনীতি

0
185

গত তিন দশক ধরে একটা ছোট্ট বুলি আমাদের ঘরে খুব পরিচিত। পরিবারের সবার কাছেই। বুলিটা হলো—টাকা নাই, পয়সা নাই। আমাদের বাপ-ছেলের এই শ্লোকটা আমি ও ফাহিম সুর করে যখন-তখন বলতাম—‘আব্বু, টাকা নাই, পয়সা নাই!’

সময়ের সঙ্গে এর আক্ষরিক গুরুত্ব হয়তো কমেছে; কিন্তু এর আনন্দ ও তৃপ্তি সামান্য এতটুকুও কমেনি, কখনোই নয়। বুলিটার শুরু যখন ফাহিম অনেক ছোট ছিল। আমরা তখন সৌদি আরবে থাকতাম। সব শিশুর মতো নানা ধরনের খেলনা ফাহিমের খুব পছন্দ ছিল। গাড়ি বা ইলেকট্রনিক খেলনা হলে তো কথাই নেই।

আমরা যখন শপিং মলে যেতাম, খেলনার দোকান হলেই ফাহিম দৌড়িয়ে ঢুকে যেত। অনেকক্ষণ কাটাত খেলনার দোকানে। তারপর বাছাবাছি করে পাঁচ-সাতটি খেলনা আঁকড়ে ধরত কেনার জন্য। আমি ওকে বুঝাতাম, এত খেলনা নিতে অনেক টাকা লাগবে, এই একটা বা দুটি নাও। দু-একটা খেলনা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার পাত্র ফাহিম নয়। ওকে অনেকভাবে বোঝাতে চেষ্টা করতাম—এখন এই দুটি নাও, সামনের সপ্তাহে আবার কিনে দেব। এত খেলনা কিনতে অনেক টাকা লাগে, আমার কাছে তো এত টাকা নেই। ফাহিমও এত সহজে ছেড়ে দেবে না। সে বলত, কোনো ব্যাংক থেকে টাকা আনো না? আমি দেখেছি, মেশিনে টিপ দিলেই টাকা বের হয়। একসময় এই ছোট্ট ছেলেকে অর্থনীতি বোঝাতে হলো। ব্যাংকে টাকা রাখতে হয়। টাকা না রাখলে মেশিন টাকা বের করবে না। চাকরি করে আমি যে টাকা পাই, তা দিয়ে অনেক কিছু কিনতে হয়, তাই এখন সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। মনে হলো ফাহিম কিছুটা বুঝল।

পরের সপ্তাহে খেলনার দোকানে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ফাহিম অনেকগুলো খেলনা আঁকড়ে ধরল। আমি বললাম, টাকা নাই, পয়সা নাই। ফাহিমও তার চিকন গলায় সুর মেলাল, টাকা নাই, পয়সা নাই। মনে হলো সেদিনের অর্থনীতির শিক্ষার কিছুটা ফাহিম মনে রেখেছে। সেদিন থেকে আমার ও ফাহিমের এই ছোট্ট ছড়া আমাদের এক অপরিহার্য আনন্দের বুলি হয়ে দাঁড়াল। ফাহিম হঠাত্ করে বলে উঠত, আব্বু, টাকা নাই, পয়সা নাই। আমিও গলা মেলাতাম। আমিও কারণে-অকারণে অনেক সময় দুষ্টামি করে বলতাম, ফামি, টাকা নাই, পয়সা নাই। ফাহিম গলা মেলাত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছিল; কিন্তু এই বুলিটার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এত দিনের সেই সুর হঠাত্ বেসুরো হয়ে গেল। কাকে আজ সুর করে শোনাব, আব্বু, টাকা নাই, পয়সা নাই!

বড় হয়েও খেলনার প্রতি ফাহিমের আগ্রহ এতটুকুও কমেনি। নিত্যনতুন ইলেকট্রনিক খেলনা ও সরঞ্জাম জোগাড় করা ছিল ফাহিমের নেশা। ফাহিমের সঙ্গে আমাকেও এসব খেলনার মহড়া দিতে হতো, ফাহিম ছাড়ার পাত্র নয়। একদিন আমার চোখে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ইয়া বড় একটা চশমা লাগিয়ে দিল। চারদিকে কত বড় বড় দালানকোঠা, নিউ ইয়র্ক শহরকেও হারিয়ে দেয়। হঠাত্ যত সব দৈত্যদানবের উপদ্রব। সব দালানকোঠা ভেঙে ফেলছে, চারদিকে আগুনের ফুলকি, কী যে ভয়ংকর! এই আরেক জগত্! ফাহিমের কী উত্সাহ, বাবাকে অন্য জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে প্রাণভরে হাসছে আর আনন্দে লাফাচ্ছে। আজ আমাকে একা রেখে ফাহিম চলে গেল আরেক জগতে। ফুরিয়ে গেল আমাদের হাসি-আনন্দের ফোয়ারা। ফাহিমকে ছাড়া এখন আমি বড্ড একা। হাসি বের হয় না, কাঁদতেও কষ্ট হয়।

একটা ছোট্ট তথ্য না জানালে ফাহিমের খেলনার গল্পের শেষ হবে না। ফাহিমও আমাকে একটা খেলনা কিনে দিয়েছিল। ওর ব্যাবসায়িক সাফল্যের প্রথম অবস্থায়, ফাহিম হঠাত্ হাজির, আমার জন্য একটা টেসলা (Tesla) গাড়ি নিয়ে। ফাদার ডের গিফট। সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি, যার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। ছেলের কাণ্ড দেখে আমি হতভম্ব! আমি ফাহিমের আম্মাকে বললাম, এটা ছোটবেলায় ফাহিমকে ওর পছন্দের সব খেলনা কিনে না দেওয়ার প্রতিশোধ। এ নিয়ে আমরা সবাই খুব হাসাহাসি করলাম। ফাহিম বলল, টাকা নাই, পয়সা নাই। কী সুন্দর দিনগুলিই না ছিল আমাদের! টেসলা আনার পুরো দিনের ঘটনাটা ফাহিম ভিডিও করে রেখেছিল (https://www.youtube.com/watch?v=cnH3uU-dgY4)। ভিডিওর ক্যাপশন হলো, ফাদার ডেতে আমার বাবাকে বিস্মিত করে একটা টেসলা উপহার দিলাম। How Sweet, কী যে সুন্দর!

ফাহিম সম্ভবত তখন চতুর্থ গ্রেডে পড়ে। জেরক্স (Xerox) করপোরেশনের একটা নতুন চাকরি নিয়ে আমি আপস্টেট নিউ ইয়র্কের রচেস্টার শহরে মুভ করেছি। এখন আর খেলনার দোকানে গিয়ে আমাকে ‘টাকা নাই, পয়সা নাই’-এর অজুহাত দিতে হয় না। তবুও ফাহিম সালেহের কেন জানি মনে হলো তার টাকা উপার্জন করার সময় হয়ে গেছে। একদিন এসে আমাকে ছো্ট্ট টুকরা কাগজে পেনসিলে আঁকা বেশ কয়েকটি কুপন দিল। বলল, আব্বু, আমি তোমার হেয়ার স্টাইল করতে চাই। প্রতিবার আমাকে এক কোয়ার্টার (২৫ সেন্ট) করে দেবে। চারবার করলে, একটা হেয়ার স্টাইল ফ্রি পাবে। একেবারে আমেরিকান মার্কেটিং! আমার চোখের সামনে এখনো সেই পেনসিল স্কেচগুলো ভাসছে পয়েন্টি (সূচালো) ৳.২৫, কার্লি (কোঁকড়ানো) ৳.২৫, ক্লামজি (হিজিবিজি) ৳.২৫, স্ট্রেইট (সোজাসুজি) ৳.২৫ এবং ৳১.০০-এ পাঁচটা। আমি অনেকক্ষণ ধরে ফাহিমের আঁকা স্কেচগুলো দেখলাম। ছোট্ট এই ফাহিম, ব্যবসার কী উদ্ভাবনী চিন্তা! আমাকে দারুণ কৌতূহলী করে তুলল। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলাম। ফাহিমের প্রথম খদ্দের হয়ে নাম লেখালাম। আমার ফাহিমের ছোট্ট আদরের হাতের পরশ আমি এখনো অনুভব করি। হেয়ার স্টাইল শেষ হলে মাঝেমধ্যে আমি দুষ্টামি করে চুলকে এলোমেলো করে বলতাম, না পয়েন্টি হয়নি, তোমাকে আবার করতে হবে। ফাহিম রেগে যেত, বলত—ড্যাড, ইউ আর এ চিটার! এই নিয়ে বাপ-ছেলের ঠোকাঠুকি ছিল প্রতিদিনের ব্যাপার।

কিছুদিনের মধ্যেই ফাহিম এই এক খদ্দেরের ব্যবসা নিয়ে বিরক্ত হয়ে পড়ল। ওর মাথায় নতুন বুদ্ধি এলো ব্যবসা বাড়াবার। ওর বয়স তখন ১০ বছর। পুনিত ফাহিমের ভালো বন্ধু। একই ক্লাসে পড়ে। ওকে নিয়ে ফাহিম শুরু করল নতুন ব্যবসা। তারা দুজনে ডলার স্টোর থেকে ক্যান্ডি (Candy) কিনে স্কুলে নিয়ে যেত। টিফিনের ছুটিতে এই ক্যান্ডি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে বিক্রি করত। এই নিয়ে ফাহিমের উত্সাহের শেষ নেই, কম দামে ক্যান্ডি কিনে বেশি দামে বিক্রি করে ওদের বেশ লাভ হচ্ছে। সন্ধ্যায় আমাকে ক্যান্ডি বিক্রির হিসাব দিত কত ডলার বিক্রি হয়েছে এবং কয় ডলার লাভ করেছে। ছোটবেলা থেকেই ফাহিম ছিল স্পষ্টবাদী। কোনো কিছুতে মিথ্যা বলা বা মা-বাবাকে লুকিয়ে কিছু করা ফাহিমের স্বভাবের মধ্যে ছিল না। তাইতো ছোটবেলায় আমরা ওকে অফুরন্ত স্বাধীনতা দিয়েছিলাম।

একসময় ফাহিমকে ক্যান্ডি ব্যবসা বন্ধ করতে হলো। স্কুলের প্রিন্সিপাল টের পেয়ে ওদের দুদিন সময় দিলেন, হাতে যে ক্যান্ডি আছ তা বিক্রি করে ফেলতে এবং এরপর ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ফাহিমকে এই নিয়ে খুব বিচলিত বা মন খারাপ করতে দেখিনি। কয়েক দিন পরেই ফাহিম শুরু করল আরেক ব্যবসার পরিকল্পনা।

ছুটির দিনে আমরা শপিং মলে গেছি কেনাকাটা করতে। ফাহিম খেলনার দোকানে গিয়ে কী একটা খেলনা পছন্দ করে ফেলল। আমাকে বলল, আব্বু, আমাকে ৪০ ডলার দাও। এটা আমার জন্মদিনের গিফট থেকে অগ্রিম নিচ্ছি। আমি বললাম, জন্মদিনের এখনো অনেক দিন বাকি। দেখলাম, ফাহিম একটা অলংকার বানাবার যন্ত্র পছন্দ করেছে। এটাতে সিসাকে গরম করে বিভিন্ন ছাঁচে ছোট ছোট কানের দুল বা গলার লকেট বানানো যায়। আমার মনে হলো ফাহিম কিছু একটা ভুল করেছে। ওকে বললাম, এটা তো ছেলেদের খেলনা নয়, এটা মেয়েদের অলংকার বানাবার যন্ত্র। ফাহিম জানাল, সে জেনেশুনে কিনছে, এটা দিয়ে অলংকার বানিয়ে সে বিক্রি করবে। পরের সপ্তাহে আমার পাগল ছেলের নতুন ব্যবসা শুরু হলো। পাড়ার খেলার মাঠে মেয়েদের কাছে কানের দুল, গলার লকেট, হাতের ব্রেসলেট ইত্যাদি বিক্রি করে টাকা জমাত। প্রতি সন্ধ্যায় ঠিক আগের মতো উত্সাহ নিয়ে আমাকে হিসাব জানাত। বারবার কয়েনগুলো গুনত। গয়না বিক্রিতে লাভ বেশ বেশি, তাই ফাহিম বেশ খুশি। ছোটকাল থেকেই আমি লক্ষ করছি, ব্যবসা করে টাকা-পয়সা জমানোর দিকটার চেয়েও সাফল্যই ফাহিমকে বেশি আনন্দ দিত। আমরা পুরো পরিবার ছোট্ট ফাহিমের এই ছোট্ট সাফল্যগুলো দারুণভাবে উপভোগ করতাম ও ফাহিমকে উত্সাহিত করতাম। লেখাপড়ার সময় সে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করত। কোন কাজ কখন অগ্রাধিকার পাবে, এ নিয়ে ছোটকাল থেকেই ফাহিমের ছিল দারুণ শৃঙ্খলা। ফাহিমের ওপর আমাদের অফুরন্ত আস্থা ছিল, ও খারাপ কিছু করবে না। মা-বাবাকে খুশি করতে না পারলে, কোনো সাফল্যই ফাহিমের কাছে সাফল্য মনে হতো না। তাইতো আমরা ফাহিমকে ছোটকাল থেকে অফুরন্ত স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। ফাহিম শেষদিন পর্যন্ত আমাদের আস্থার সেই মর্যাদা রেখেছে। সে জন্য আমরা প্রতিদিন হাত তুলে ফাহিমকে স্যালুট করি।

ফাহিমের ছোট্টকালের ব্যবসার আরেকটা বিশেষ স্মৃতি না বললেই নয়। ফাহিম লাভের টাকা থেকে ৪৫ ডলার একসময় ওর বড় বোন এনঞ্জেলাকে ধার দেয়। প্রথম কলেজে যাওয়ার সময় এনঞ্জেলা সম্ভবত কিছু অতিরিক্ত টাকা সঙ্গে রাখতে চেয়েছিল। কিছুদিন পর এই টাকা নিয়ে ভাই-বোনের বিরাট ঝগড়া। এনেঞ্জেলার ধারণা, এই টাকা ও কোনো একসময় শোধ করে দিয়েছে। ফাহিম সেটা কোনোভাবেই স্মরণ করতে পারছিল না। কলেজের বিরতিতে যখনই এনঞ্জেলা বাড়িতে আসত, এই বিবাদ আবার শুরু হতো। একদিন আমার স্ত্রী  রায়হানা বলল, এই কয়টা টাকা নিয়ে ওদের চিত্কার আর ভালো লাগছে না, তুমি একটা কিছু করো। আমি চেষ্টা করলাম এর মীমাংসা করতে। বললাম, ৪৫ ডলার আমি আমার পকেট থেকে দিয়ে দিচ্ছি। তোমাদের এই ঝগড়া বন্ধ করতে হবে। তারা দুজনেই আমার টাকা নিতে অস্বীকার করল। আমার মনে হচ্ছিল, ওরা এই বিবাদটা জিইয়ে রাখতেই চেয়েছিল। ওরা দুজনেই একসময় নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে নিজেদের জন্য বাড়ি কেনার টাকা জোগাড় করেছিল; কিন্তু এই ৪৫ ডলারের বিবাদ মীমাংসা করার প্রয়োজন বোধ করেনি। বড় হয়েও এই টাকা নিয়ে খোঁটাখুঁটি যখন-তখন লেগে যেত। হয়তো বা বাসায় বসে সবাই পুরনো দিনের ঘটনা স্মৃতিচারণা করছি কিংবা ম্যানহাটনের রেস্টুরেন্ট বসে সবাই ডিনার করছি, হঠাৎ শুরু হতো সেই কৃত্রিম বিবাদ। আমাদের জীবনের অনেক সুন্দর সন্ধ্যা কেটেছে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ম্যানহাটনে আউটিং করে। ওদের তিন ভাই-বোনের ঝগড়া, আনন্দ ও উচ্ছলতা—সবই আমরা প্রাণভরে উপভোগ করতাম। এই দিনগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। আর কখনো নয়!

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY