পনেরোই আগস্ট: মুক্তিযুদ্ধের নেতা ও নীতি দুটোই ছিল টার্গেট

0
46
পনেরোই আগস্ট: মুক্তিযুদ্ধের নেতা ও নীতি দুটোই ছিল টার্গেট

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। কথা ছিল যে সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। ঘুরে ফিরে দেখবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই তাকে এক সময় বহিষ্কার করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের ন্যায়সঙ্গত দাবিতে পরিচালিত ধর্মঘট সংগ্রামের প্রতি তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন। সংহতিমূলক ছাত্র ধর্মঘট সংগঠিত করে সরাসরিভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ছিল তার ‘অপরাধ’। এ ঘটনার প্রায় তিন দশক পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই সেই বহিষ্কৃত ‘শেখ মুজিবুর রহমানকে’ সসম্মানে বরণ করে নিতে প্রস্তুত হয়েছিল।

বেশ কিছুদিন আগেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নিতে। উৎসবের আমেজে সুসজ্জিত ও মুখরিত হয়েছিল ক্যাম্পাসের সবগুলো ভবন, আঙ্গিনা, প্রাঙ্গণ। কথা ছিল যে, ক্যাম্পাসে পদার্পণের পর বঙ্গবন্ধু প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশের শহিদদের মাজার জিয়ারত ও সেখানে পুষ্পমাল্য অর্পণ করবেন। তারপর তিনি জগন্নাথ হল ও সেখানকার বধ্যভূমিতে, শহীদুল্লাহ হল হয়ে ফজলুল হক হলে যাবেন। অতঃপর তিনি শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে টিএসসি মিলনায়তনের এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেবেন। বঙ্গবন্ধুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসের সর্বত্র ছিল ব্যাপক তোড়জোড়। হাজার হাজার ছাত্র ও সাধারণ মানুষ যেন বঙ্গবন্ধুর কথা শুনতে পারেন সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কলা ভবন, মল চত্বর, নীলক্ষেত, শহিদ মিনার, চানখাঁরপুল, দোয়েল চত্বর এলাকাজুড়ে মাইক লাগানো হয়েছিল। কথা ছিল যে সকাল থেকে এ মাইকে দেশাত্মবোধক গান, কবিতা আবৃত্তি, যন্ত্রসংগীত ইত্যাদি প্রচার করা হবে। একটি উদ্দীপনামূলক ও আনন্দঘন আবহে পুরো ক্যাম্পাসকে ভরিয়ে তোলা হবে। পুরো এলাকা সুন্দর সুন্দর ব্যানার, হোর্ডিং, ফেস্টুন ইত্যাদি দিয়ে সুশোভিত করা হয়েছিল। সবারই অধীর অপেক্ষা, কখন ১৫ আগস্টের সূর্যোদয় হবে, কখন বঙ্গবন্ধু ক্যাম্পাসে পদার্পণ করে আলোকিত করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে।

কিন্তু পর্দার পেছনে চলছিল কুটিল-হিংস ষড়যন্ত্রের আয়োজন। ষড়যন্ত্রকারীরা দুর্বল ছিল না। তাদের সঙ্গে ছিল আন্তর্জাতিক মদদ। সরকারের নানা ব্যর্থতা, গুরুতর ভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতির ফলে সৃষ্ট গণবিচ্ছিন্নতার সুযোগে তারা সুকৌশলে তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এনেছিল। বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে চরম উদাসীনতা, এবং শত্রু যে কত ভয়ংকর বর্বর হতে পারে সে সম্পর্কে উপলব্ধির দুর্বলতাকে তারা কাজে লাগিয়েছিল। ঘরের ভেতরেই ছিল ঘাতক শক্তির চর।

সে সময় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে চলছিল নানা দ্বন্দ্ব-বিরোধ এবং আদর্শগত বিভ্রান্তি। ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, জোট নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র অভিমুখীনতা ইত্যাদি নীতির প্রতি বৈরী একটি শক্তি সব সময় আওয়ামী লীগের ভেতরে সক্রিয় ছিল। তাদের নেতা খুনি মোশতাক বঙ্গবন্ধুর খুব কাছে স্থান করে নিয়েছিল। মোশতাককে দাউদকান্দি আসন থেকে জিতিয়ে আনার জন্য ফলাফল ঘোষণা বন্ধ রেখে ব্যালট বাক্স হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে ‘চূড়ান্ত’ ফলাফলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক নির্মম ট্র্যাজেডির মাধ্যমে ইতিহাস এ কথা প্রমাণ করল যে, সব ‘বিজয়ই’ বিজয় নয়, কোনো কোনো ‘বিজয়’ তিক্ততম ‘পরাজয়ে’র চেয়েও বিপজ্জনক।

বঙ্গবন্ধু যে মোশতাকের ষড়যন্ত্রমূলক চরিত্র সম্পর্কে জানতেন না, তা নয়। কিন্তু ‘কোনো বাঙালি আমার গায়ে হাত তুলবে না, হাত তুলতে গেলে তার হাত কেঁপে যাবে’-মর্মে তার অন্ধবিশ্বাস ছিল। ১৫ আগস্টের কয়েকদিন আগে তিনি আমাকে এ কথাগুলো বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ‘বাঙালি’ বুঝতেন, কিন্তু তিনি সেভাবে ‘শ্রেণি-দ্বন্দ্বের’ বিষয়টি বুঝতেন না। প্রতিক্রিয়াশীল ‘শ্রেণিশত্রু’ যে কত ধূর্ত ও ভয়ংকর হতে পারে তার হিসাব কষতে বঙ্গবন্ধুর ভ্রান্তি ঘটেছিল। সেটাই হয়ে উঠেছিল তার জন্য প্রাণঘাতী।

১৫ আগস্টের ঘাতক কালো শক্তি লোকচক্ষুর অন্তরালে নিখুঁতভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। তারা প্রচারণা চালিয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দিয়ে নিজেকে ‘আজীবন রাষ্ট্রপতি’ হিসাবে ঘোষণা করবেন এবং দেশে ‘রাজতন্ত্র’ প্রবর্তন করবেন। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে তারা নিবিড় সংযোগ স্থাপন করেছিল। রাষ্ট্রের কিছু স্পর্শকাতর স্থানে তারা অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে অন্তর্ঘাতের আয়োজন সম্পন্ন করেছিল।

১৫ আগস্টের আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। ১৩ আগস্ট পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা সংবলিত একটি লিফলেট ক্যাম্পাসের দু-চারটি জায়গায় বিতরণ করা হয়েছিল। ১৪ আগস্ট সকালে শামসুন্নাহার হলের গেটের পাশে দেওয়ালে পাকিস্তানের পতাকা সাঁটানো হয়েছিল। বেলা ১১/১২টার দিকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসংলগ্ন একটি স্থান, সাইন্স অ্যানেক্স বিল্ডিং-এর দোতলায় গণিত বিভাগের বাথরুমসহ ২/৩টি স্থানে শক্তিশালী গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়েছিল। নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের সতর্কতা বাড়াতে হয়েছিল। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আমরা দ্রুত খবর দিয়েছিলাম। তা ছাড়া আমরা নিজেরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের গোটা ক্যাম্পাস এলাকায় নজরদারি ও পাহারার উদ্দেশ্যে টহল দেওয়ার কাজে রাতভর নিয়োজিত ছিলাম। শেখ কামালও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। রাত একটার দিকে, বাড়ি যাওয়ার জন্য আমার কাছে অনুমতি চেয়েছিল। সদ্য তার বিয়ে হয়েছে এ কথা চিন্তা করে এবং বঙ্গবন্ধুর মোটরকেডের পরিবর্তে সকাল ৮টার মধ্যে সে আলাদাভাবে ক্যাম্পাসে আসবে, এই শর্তে তাকে আমি যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলাম। আজও আমার মনে এ কথা ভেবে যন্ত্রণা হয় যে, শেখ কামালের জীবন হয়তো রক্ষা পেত যদি আমি সেদিন আরেকটু ‘অমানবিক’ হতাম এবং তাকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে আমাদের সঙ্গে রেখে দিতাম!

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্পাপ রাসেল, বেগম মুজিব, শেখ নাসের, কামাল, জামাল ও তাদের সদ্য পরিণয়ে আবদ্ধ নববধূ সুলতানা ও রোজী-কাউকেই রেহাই দেয়নি ঘাতকরা। হত্যা করা হয়েছিল কর্নেল জামিলকে। নিহত হয়েছিলেন ৩২ নম্বর বাড়িতে অবস্থানকারী আরও বেশ কয়েকজন। একই সময় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল শেখ ফজলুল হক মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে। হত্যা করা হয়েছিল ওই দুটি বাড়ির মানুষকে। কামানের গোলায় নিহত হয়েছিল মোহাম্মদপুরের কয়েকজন সাধারণ নাগরিক। ১৫ আগস্টের বিভীষিকাময় এ হত্যার ঘটনা জুলিয়াস সিজারের হত্যাকাণ্ড, নবাব সিরাজউদ্দৌলার হত্যাকাণ্ড, দিল্লির সম্রাট বাহাদুর শা’র সন্তানদের হত্যা ও বর্বর নিগ্রহ এবং কারবালার হত্যাকাণ্ডের ট্র্যাজেডিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। শোকের মাতমে ডুকরে ওঠে বুক। যত বড় অপরাধ করেছিল জুডাস, ব্রুটাস, এজিদ, মীরজাফর-এদের মতোই ঘৃণ্য অপরাধ করেছিল ১৫ আগস্টের খুনিরা।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল মানবিকতা, নৈতিকতা, আইন-কানুন ও সামাজিক মানদণ্ডের নিরিখে একটি ভয়ংকর অপরাধ। কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডটি একই সঙ্গে ছিল একটি ‘দেশদ্রোহিতামূলক রাজনৈতিক অপরাধের ঘটনা’। তা প্রথমত এ জন্য যে, সেদিন দেশের রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। সেদিন সংবিধান লঙ্ঘন করে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির আসনে স্বঘোষিতভাবে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছিল খুনি মোশতাক। মোশতাকের যোগসাজশে বঙ্গভবনে বসে ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল মোশতাকের ‘সূর্যসন্তান’ খুনি মেজরের দল।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড একটি ‘রাজনৈতিক অপরাধের’ ঘটনা ছিল এ কারণেও যে, এ ঘটনার সঙ্গে আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ছিল পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার দেশসহ কিছু বিদেশি শক্তি। ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম প্রচার করেছিল এবং বাংলাদেশকে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করা শুরু করেছিল। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সম্পৃক্ততার তথ্য প্রমাণসমেত অনেক দলিল-পত্র ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনা পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে স্পষ্টভাবেই যুক্ত ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা ষড়যন্ত্রমূলক শক্তি ও উপাদান।

তৃতীয়ত এবং এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধান যে কথাটি বলতে হয় তা হলো, ১৫ আগস্টের বর্বর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র ও মর্মবাণী উল্টোপথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আঘাত হানা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল অর্জনগুলোর ওপর। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভৌগলিক-রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বের হয়ে এসে একই চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশবাসী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। মুক্তিযুদ্ধ একটি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ প্রয়াস ছিল না। পাকিস্তানকে দ্বি-খণ্ডিত করে তার পূর্বাংশে একটি দ্বিতীয় পাকিস্তান কায়েম করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। আমাদের মহান এ মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ‘জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম’। সেটা ছিল কয়েক যুগ ধরে পরিচালিত জনগণের সার্বিক সংগ্রামী অভিযাত্রার শীর্ষবিন্দু। সেটা ছিল একটি ‘জনযুদ্ধ’। পাকিস্তানি মতাদর্শ, সামাজিক-অর্থনৈতিক নীতি ও রাজনৈতিক চরিত্রকে নেতিকরণ (negate) করেই নতুন নীতি-আদর্শ-বৈশিষ্ট্য-ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ। এবং এ সামগ্রিক গণ-সংগ্রামের সবটুকু নির্যাস ও নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের চরিত্র-ভিত্তি মূর্ত রূপ পেয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানে। বিশেষত গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র-তথা সেই সংবিধানে বর্ণিত ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রের সেই মূল ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের নেতাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে হনন করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারা। ‘ফরমানের’ দ্বারা প্রথমে মোশতাক ও পরে সামরিক শাসক জিয়া এবং এরশাদ বদলে দিয়েছিল ’৭২-এর সংবিধানের মৌল চরিত্র ও ভিত্তি। সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের নীতি। ত্রিশ লাখ শহিদের রক্ত ও বহু যুগের গণ-সংগ্রামের ফসল, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারাকে যে সংবিধানের মাধ্যমে ’৭২ সালে মূর্ত রূপ দেওয়া হয়েছিল, তাকে উল্টে দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ও শোষণ-লুটপাটের নীতি ও ধারা।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়লেও হতবিহ্বল না হয়ে কলাভবনের চত্বরে দাঁড়িয়েই তৎক্ষণাৎ কর্তব্য স্থির করে ফেলেছিলাম। কয়েকজন ছাত্র নেতাকে নিয়ে প্রথমে হাতিরপুলের একটি বাসায় উঠে টেলিফোনে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের নির্দেশ পাওয়া মাত্র প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিলাম। এদিকে চারদিকের খবরা-খবরও যথাসম্ভব নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। একের পর এক খবর আসছিল যে ঘাতক মেজররা ক্ষমতায় তাদের অবস্থানকে ক্রমেই সুসংহত করতে সক্ষম হচ্ছে। দুপুরের আগেই তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিডিআর, পুলিশ প্রধানরা একে একে খুনি সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। মাত্র ৪-৫ জন বাদে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সব সদস্য একের পর এক খুনি মোশতাকের মন্ত্রী হিসাবে শপথ নিতে থাকেন।

দুপুরের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পাশাপাশি এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটাতে সফলকাম হয়েছে। সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়। ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান টহল দিতে থাকে। বেতারে খুনিদের পক্ষে একতরফা প্রচারণা চলতে থাকে। দেশের সংবিধানকে ও মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে ‘পাকিস্তানি’ ধারায় রূপান্তরের কাজ শুরু হয়। ‘মুজিব হত্যার’ প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য উন্মোচিত হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের সরকারই বহাল রয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীরাই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে-মানুষের মনে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়। ‘বঙ্গবন্ধুকে তো আর ফিরিয়া আনা যাবে না, কিন্তু অন্তত আওয়ামী লীগেরই মন্ত্রিসভা তো বহাল আছে’-এ কথা বলে সেই দলের নেতাকর্মীদের নিস্তেজ ও বিভ্রান্ত করে রাখা হয়। এ সবের ফলে আমরা অনুধাবন করি যে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ মিছিল করার মতো অবস্থা নেই। তাই, আগে কিছুটা প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তার পর প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হওয়া মাত্র ক্যাম্পাসে মিছিল করার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্য প্রতিরোধ সূচনা করা হবে।

এ সময় অল্প কয়েকজন বাদে আগে ছাত্রলীগ করে আসা কর্মীরা প্রায় সবাই উধাও হয়ে যায়। সেসব নেতাকর্মী আগে থেকে যারা ছাত্র ইউনিয়ন করে এসেছে প্রধানত তাদেরই সাহস নিয়ে প্রকাশ্যে কাজ করার জন্য পাওয়া গিয়েছিল। অক্টোবরের ২০ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হয়। আগেই পরিকল্পনা করে ক্যাম্পাস চালু হওয়ার পর ২১ তারিখে, প্রধানত ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের নেতৃত্বে ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই’ স্লোগান দিয়ে কলাভবনের সব করিডরে ঝটিকা মিছিল হয়। ছাত্র-শিক্ষকরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে ওঠে। পরপর কয়েকদিন ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বক্তৃতা করে মুজিব হত্যার প্রতিবাদ করার জন্য ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের আহ্বান জানানো হয়। ৪ নভেম্বর শোক মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। একটি লিফলেট ছাপিয়ে প্রচার করা হয়। লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে যায়। কিন্তু কোনো কিছুতে আমরা দমিত হইনি।

৪ নভেম্বর বহু আগেই আমাদের ঘোষণা করা কর্মসূচি অনুযায়ী আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় হাজারে হাজারে সমবেত হই। আমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে আমি আবেগময় বক্তৃতা দেই। এরপর ৩২নং-এর বাড়ি অভিমুখে মৌন মিছিল শুরু হয়। নীলক্ষেত ফাঁড়ির সামনে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে মিছিলকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে যাই। ৩২নং-এর বাড়ির বন্ধ গেটের সামনে সবার পক্ষ থেকে পুষ্পমাল্য অর্পণ করি। ঢাকার রাজপথে এটিই ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রথম মিছিল।

১৫ আগস্টের ঘটনার শিকার ছিল দ্বি-বিধ। প্রথমত তার শিকার ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজন এবং তাদের সঙ্গে থাকা কিছু মানুষ। দ্বিতীয় শিকার ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি তথা রাষ্ট্রের চরিত্র, সংবিধান ও চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি। সেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। এবং এই রাজনৈতিক অপরাধকে অপরিবর্তনীয় করার জন্যই পরে জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ও মুক্তিসেনানীদের দেশ হয়েও আমরা মুক্তিযুদ্ধের এ সম্পদকে রক্ষা করতে পারিনি। এবং আজও তা পরিপূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করা যায়নি। এটি ইতিহাসের আরেকটি ট্র্যাজেডি। জাতির অব্যাহত থাকা আরেকটি কলঙ্ক।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY