প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষির নেতৃত্ব দেবে তরুণরা

0
87

কৃষক যুগের পর যুগ খাদ্য নিরাপত্তা জুগিয়ে গেছেন। এই মহামারিকালেও খাদ্যের জোগান দিয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন দেশের প্রান্তিক কৃষক। কিন্তু দেশে কৃষি শ্রমিকের সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। কৃষিতে এই প্রজন্মের তরুণরা আর আসতে চাচ্ছেন না। তাই কৃষিতে উৎপাদন খরচ কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার বলে মনে করছেন কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দ্য মেটাল প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সাদিদ জামিল। তিনি বলেছেন, যত শিল্পায়ন হবে কৃষি শ্রমিকের সংকট তত প্রকট হবে। এ জন্য ধীরে ধীরে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে অর্থের সংকট আগে দূর করতে হবে। এ জন্য স্বল্প সুদে ঋণের জোগান দিতে তহবিল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, দেশের তরুণদের হাত ধরেই প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির বিকাশ ঘটবে এবং কৃষকের দিনবদল হবে।

যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে ১৯৮৭ সালে ‘দ্য মেটাল প্রাইভেট লিমিটেড’ গড়ে তোলেন সাদিদ জামিল। কৃষির যান্ত্রিকীকরণের পথিকৃৎ মেটাল ১৯৯৩ সালে প্রথম ‘ট্যাফে’ ব্র্যান্ডের কৃষি ট্রাক্টর এনেছিল। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি সর্বপ্রথম কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য নিজ উদ্যোগে কৃষকদের ঋণ সুবিধা প্রদান শুরু করে। মেটাল গ্রুপের আছে ১৩ প্রতিষ্ঠান, যেখানে কাজ করছেন প্রায় এক হাজার ৭০০ কর্মী। শুরুতে ট্রাক্টর বিক্রি করলেও এখন কৃষিযন্ত্র তৈরি ও আমদানি, বীজ উৎপাদন, অটোমোবাইল, মোবাইলের টাওয়ার নির্মাণ ও পরিচালনাসহ বিভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত মেটাল।

প্রকৌশলী সাদিদ জামিল বলেন, ‘আমাদের কৃষকের গড় বয়স হচ্ছে ৪৮, যেটা ২৫ বছর আগে ছিল ২৮ বছর। অর্থাৎ তরুণরা কৃষিতে আসছেন না। কৃষকের ছেলে আর কৃষক হচ্ছেন না। তবে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাইজেশন বাড়লে তরুণরা কৃষিতে আসবেন। এখন অনেক দেশে ড্রোন দিয়ে কৃষিতে সার-বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে।’

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর, ড্রোনের ব্যবহার হচ্ছে কৃষি খাতে। বাংলাদেশেও এটি চলে আসবে বলে মনে করেন মেটালের এমডি। তিনি বলেন, ‘আগামী বছর দেশে ফাইভজি প্রযুক্তি এলে কৃষি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে নতুন বিপ্লব হবে। তখন মেশিন টু মেশিন কমিউনিকেশন হবে। এ জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমি নিজে চীনে ড্রোন দিয়ে কৃষি পরিচর্যা দেখে এসেছি। আমাদেরও সেই পথে যেতে হবে। সেচে সোলারের ব্যবহার বাড়াতে হবে।’

দেশে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ১৯৬০ সালে শুরু হলেও ১৯৯০ সালের পর আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। এর মধ্যে ট্রাক্টর ১৮ শতাংশ, পাওয়ার টিলার ৮০ শতাংশ। বাকি ২ শতাংশ জমি কৃষক গবাদি পশুসহ বিভিন্নভাবে প্রস্তুত করেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (বিরি) কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যায়, যান্ত্রিক উপায়ে বীজ-চারা রোপণ .১০ শতাংশেরও কম। দেশে চারা বা বীজ রোপণ প্রায় শতভাগ ম্যানুয়ালি করা হয়ে থাকে।

ধান কাটার কাজে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগে। এ কাজে মূলত দুই ধরনের মেশিন ব্যবহার করেন দেশের কৃষকরা। একটি রিপার, অন্যটি কম্বাইন হারভেস্টার। রিপার দিয়ে শুধু ধান কাটা যায়। আর কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধানকাটা, মাড়াই থেকে শুরু করে বস্তায় ভরা পর্যন্ত করা যায়। প্রতিটি মেশিন ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। এই মেশিন কেনার জন্য হাওরাঞ্চলে ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য অঞ্চলে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এর পরও কৃষককে ৬ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জোগান দিতে হয়। এ জন্য সরকার কৃষকদের ছোট ছোট গ্রুপ করে দিয়েছে, যাতে তাঁরা সম্মিলিতভাবে মেশিন কিনতে পারেন। বর্তমানে দেশে ৮৯৬টি কম্বাইন হারভেস্টার এবং প্রায় পাঁচ হাজার রিপার মেশিন রয়েছে। এ দিয়ে ১০ শতাংশ জমির ধান কাটা যায়।

প্রকৌশলী সাদিদ জামিল বলেন, যন্ত্রের ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় ৪০ শতাংশ কমে যায়। এখন যে শ্রমিক সংকট হচ্ছে, তা কাটাতে এবং সময় ও শ্রমের সাশ্রয় করতে যান্ত্রিকীকরণে জোর দিতে হবে। আমাদের কৃষিমন্ত্রীও সব সময় বলছেন, কৃষির আধুনিকায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে। কৃষিকে ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। সাম্প্রতিককালে কৃষির ওপর নির্ভর করেই একটি উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠেছে। তাঁরা কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে ব্যবসা করছেন। প্রান্তিক কৃষকরা এসব যন্ত্রপাতি কিনতে পারছেন না। তাঁরা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সেবা পাচ্ছেন।

কৃষিযন্ত্রের বেশির ভাগই চীন, ভারতসহ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা হয়। আমদানি শুল্ক আরো কমালে এসব যন্ত্রপাতির দাম আরো কমে যাবে। এতে এসব যন্ত্রপাতি আরো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে বলে জানালেন প্রকৌশলী সাদিদ জামিল। তিনি বলেন, ‘একটি কম্বাইন হারভেস্টারের দাম ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত। সরকার এই খাতে অর্ধেক ভর্তুকি দিলেও বাকি অর্ধেক টাকা একটি মেশিন কিনতে লাগছে, সেখানে সহায়তা করার কেউ নেই। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো তেমন এগিয়ে আসছে না। আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তাঁদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু এই খাতে স্বল্প সুদে সরকারের তহবিল খুব জরুরি। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রসারে এর কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি জানান, ব্যাংকগুলোকে তাদের বিনিয়োগের ২ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তারা ঋণ সংগ্রহের ঝামেলা এড়াতে তা অনেকে ঠিকমতো দিচ্ছে না। তারা এনজিওদের এসব ঋণ দিয়ে ২ শতাংশের টার্গেট অর্জন করে। এই সংকট দূর করাটাই এখন বড় কাজ।

করোনাকালে কৃষি শ্রমিকের সংকট দেখা দিলে মেশিন দিয়ে প্রচুর ধান কাটা হয়েছে বলে জানালেন দ্য মেটাল লিমিটেডের এমডি। তিনি বলেন, ‘২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে মার্চ, এপ্রিলে এসে প্রধানমন্ত্রী আরো ১০০ কোটি টাকা দিলেন। এই ২০০ কোটি টাকা আসায় বোরোতে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের ব্যবহার বেড়েছে।’ তিনি জানান, সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সরকার ৩০২০ কোটি টাকা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্রয়ে দিচ্ছে।

আগামী বাজেটে আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ জানাই দেশের কৃষির বিকাশে কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত এআইটি, শুল্ক উঠিয়ে দেওয়ার জন্য।

সরকারি হিসাবে দেশের কৃষি উৎপাদনে বছরে ১৫ হাজার মেশিন দরকার। কিন্তু এসব মেশিন পরিচালনার জন্য দক্ষ অপারেটর নেই বলে জানালেন প্রকৌশলী সাদিদ জামিল।

দেশে কৃষি যন্ত্রপাতির বাজার ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার। এত বড় খাতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থানীয়ভাবে যন্ত্র সংযোজনের পরিকল্পনাও করছে মেটাল। প্রতিষ্ঠানের এমডি বলেন, ‘সনাতনি পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে কৃষিকে কমার্শিয়ালাইজ করতে হবে। এখানেও ব্যাবসায়িক ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আগামীতে কৃষিতে অর্গানিক ফার্টিলাইজার, মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট নিয়ে কাজ করবে মেটাল। আমরা কৃষিতে আরো মনোযোগ বাড়াতে চাই।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY