৩১৩ অর্থদাতা চিহ্নিত হেফাজতের

0
22

দেশ-বিদেশ থেকে ৩১৩ জন হেফাজতে ইসলামকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন। মাওলানা মামুনুল হকসহ কয়েকজন নেতা এসব টাকা নাশকতামূলক কাজে খরচ করেছেন। মামুনুল ঢাকা শহরে বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠার কথা বলেও টাকা সংগ্রহ করেন। তাঁর ব্যাংক হিসাবে ছয় কোটি টাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আরো কয়েক কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। কয়েক বছর ধরে মামুনুলসহ উগ্রপন্থী নেতারা হেফাজতকে পাকিস্তানের ‘তেহরিক-ই-লাব্বায়িক’ নামের সংগঠনের আদলে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এর মাধ্যমে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে তৈরি করতে চেয়েছেন তাঁরা। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তকারীরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে মামুনুলের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণার খোঁজে তাঁর বাবার সাধারণ ডায়েরির (জিডি) পর গতকাল মঙ্গলবার তাঁকে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে ডিবি। তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে গত রবিবার রাতে তড়িঘড়ি করে হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত করে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর সংগঠনটির ভেতরে-বাইরে নানা গুঞ্জন চলছে। নতুন কমিটি ও তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে রেখেছে পুলিশ। সাবেক আমির আল্লামা আহমেদ শফীর অনুসারীরা এই কমিটির বিরোধিতা করছেন। আহ্বায়ক কমিটি গঠনের আগে ও পরে তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি শীর্ষ নেতাদের। ঈদের পরই পাল্টা একটি কমিটি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শফীপন্থী নেতারা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, হেফাজতের টাকার জোগানদাতা ৩১৩ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মামুনুল হকের ব্যাংক হিসাবে ছয় কোটি টাকার তথ্য মিলেছে। তিনি আরো বলেন, হেফাজতের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আমির জুনাইদ বাবুনগরীর ছেলের বিয়েতেই সাবেক আমির আল্লামা শফীকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়। ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে মামুনুল হক, জুনাইদ আল হাবিবসহ কয়েকজন নেতার বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে আল্লামা শফীকে সরিয়ে বাবুনগরীকে আমির করার পরিকল্পনা করা হয়।

গত ১৮ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া মাদরাসা থেকে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের পর হামলা ও চুরির মামলায় সাত দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গত সোমবার তাঁকে আদালতে হাজির করে অন্য দুই মামলায় আরো সাত দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়া আরো ১৪ হেফাজত নেতাও রিমান্ডে আছেন।

তদন্তকারী সূত্র জানায়, হেফাজত নেতাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের ‘তেহরিক-ই-লাব্বায়িক’ নামের সংগঠনের আদলে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশকে গঠন করে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি এ দেশেও করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। জঙ্গি সংগঠন ও জামায়াতে ইসলামের কানেকশনও পেয়েছেন তদন্তকারীরা। গত শনিবার গ্রেপ্তার হওয়া নায়েবে আমির আহমদ আবদুল কাদের ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। হেফাজতে ইসলামের বেশির ভাগ নেতাই জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে জড়িত। মাদরাসার শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সরকার উত্খাত করে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা এঁটেছিলেন হেফাজত নেতা মামুনুল হক। কাওমি মাদরাসার নামেও টাকা তুলে নাশকতায় ব্যয় করা হচ্ছিল। অর্থদাতাদের বিস্তারিত পরিচয় সংগ্রহ করে তাঁদের ব্যাপারে তদন্ত করা হবে বলে সূত্র জানায়।

এদিকে গতকাল মোহাম্মদপুরে মামুনুলের বোন দিলরুবার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁর কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণাকে উদ্ধার করেছে ডিবি পুলিশ। গত সোমবার তাঁকে উদ্ধারের জন্য কলাবাগান থানায় জিডি করেন ঝর্ণার বাবা ওলিয়ার রহমান। এর আগে ১১ এপ্রিল ঝর্ণার বড় ছেলে আব্দুর রহমান জামি মাকে উদ্ধারের আবেদন জানিয়ে পল্টন থানায় জিডি করেন। উদ্ধারের পর ঝর্ণাকে আটকে রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গত ৩ এপ্রিল রিসোর্টকাণ্ডের পর ফোনালাপ প্রকাশ হলেও ঝর্ণা ছিলেন আড়ালে। তাঁকে মামুনুল গোপন স্থানে সরিয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ করছিলেন স্বজনরা। গ্রেপ্তারের পর মামুনুল জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ঝর্ণাকে তিনি সাক্ষী রেখে শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে করেছেন, তবে কাবিননামা নেই। বিয়েটি ছিল চুক্তিভিত্তিক। ভরণ-পোষণ দেওয়া হলেও স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার পাবেন না ঝর্ণা। মামুনুল আরেকটি চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করেছেন বলেও স্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে গত রবিবার রাতে গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন চাপে পরে কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও কোনো মহলের আস্থায় পৌঁছাতে পারেনি হেফাজত। পরবর্তী নেতৃত্ব এবং সংগঠন পরিচালনা নিয়ে চলছে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা। সদ্য বিদায়ী আমির জুনাইদ বাবুনগরী তাঁর গ্রুপের লোকজনকেই আহ্বায়ক কমিটিতে রেখেছেন। ফলে প্রয়াত আমির আহমেদ শফীর অনুসারী এবং পদবঞ্ছিত নেতারা এই কমিটির বিরোধিতা করছেন। বড় পরিসরের আহ্বায়ক ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেমন হবে তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। প্রশাসনের শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দিতে কমিটি ভাঙা হলেও আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মধ্যেও রাজনীতি দেখছেন গোয়েন্দারা।

আল্লামা শফীর সময়ের কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহী বলেন, ‘সংগঠনের নীতি আদর্শকে ধারণ করে এমন কমিটি হয়নি। কমিটি গঠন নিয়েও প্রতিষ্ঠাতা আমিরের অনুসারী নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তাই আমরা আগের কমিটির সংস্কার করে নতুন কমিটির ঘোষণা করব। ঈদের পরই এই কমিটি ঘোষণা করা হবে।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY