ভাস্কর্য ভাঙার বিচার হয় না

0
267

স্মৃতি সংরক্ষণ, সচেতনতা জাগানোসহ অনিন্দ্যসুন্দর শিল্পকর্ম ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার ঘটনায় দেশে কার্যকর তদন্ত ও বিচারের নজির নেই। উগ্রবাদীরা প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে ভাস্কর্য ভেঙে ফেললেও তাদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। এই শিল্প রক্ষায় সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হচ্ছে। তবে ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতীতে কখনো অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়নি, কিংবা শনাক্ত করা গেলেও বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। উল্টো হুমকির কারণে ভাস্কর্য অপসারণ বা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

সর্বশেষ গত শুক্রবার কুষ্টিয়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় গত শনিবার কুষ্টিয়া মডেল থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে। দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে শনাক্তের পর চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে বুধবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে ‘মধুসূদন দে স্মৃতি ভাস্কর্য’র একটি অংশ ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশের অনেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে মধুসূদন দে ও তাঁর পরিচালিত রেস্তোরাঁটির স্মৃতি জড়িত। মুক্তিযুদ্ধে নিহত হওয়া মধু দের স্মরণে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। ঘটনার পরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভেঙে ফেলা কানের অংশটি সংস্কার করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, কারা, কী উদ্দেশ্যে কাজটি করেছে, তা খুঁজে বের করতে পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ওসি মামুন আর রশিদ বলেন, ‘ঘটনা জানার পর আমরা খোঁজ নিয়েছি। বিষয়টি কিভাবে হলো তাও খতিয়ে দেখছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও কাজ করছে। তবে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মামলা বা জিডি হয়নি।’

কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ সব ভাস্কর্য রক্ষার নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করা হয়েছে। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দুষ্কৃতকারীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, সাধারণ কোনো ভাস্কর্য রক্ষায় দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। ‘বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংরক্ষণ’ নামে যে আইনটি ছিল তা চারদলীয় জোট সরকার আমলে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য রক্ষায় আপাতত দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাস দমন আইন প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরকারি সম্পত্তি হিসেবে রক্ষার জন্য ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫(৩) ও ২৫(ডি) এবং সন্ত্রাস দমন আইনের ৩ ও ৪ ধারা প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। আর এই ধারায় বর্ণিত অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা প্রমাণ করা গেলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা যেকোনো মেয়াদে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব। অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতির জনক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরকারি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে তা ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য রক্ষায় বিশেষ আইন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা। তাঁরা বলছেন, অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া গেলে এ ধরনের অপরাধ দমানো সম্ভব হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন রয়েছে। এ আইনের ১৫(৩) ও ২৫(ডি) ধারা অনুযায়ী সরকারি সম্পত্তি বিনষ্টকারী ও বিনষ্টের ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে দেশে যা হচ্ছে তা একটি অন্তর্ঘাতমূলক কাজ। যারা এ কাজের ষড়যন্ত্র করছে তাদের এ আইনের আওতায় আনা যেতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে তা রক্ষায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের ব্যবহার করতে পারে সরকার। এ ছাড়া সন্ত্রাস দমন আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু  বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়ে একটি দুষ্কৃতকারী মহল দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি করতে চায়। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে। রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের ক্ষতি করা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। সুতরাং এখনই দুষ্কৃতকারীদের থামাতে হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

আগেও ভাঙা হয় ভাস্কর্য

জানা গেছে, আশির দশকে জিপিওর সামনে স্থাপিত বর্শা নিক্ষেপের ভাস্কর্যটি রাতের অন্ধকারে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। পরে জানা যায়নি কে বা কারা এটি সরিয়েছে। ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর রাতে রাজধানীর বলাকা ভবনের সামনের রাস্তায় ‘বলাকা’ ভাস্কর্যে হামলা চালান ওলামা আঞ্জুমানে আল বাইন্যাত নামের উগ্রবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় পুলিশ আটজনকে গ্রেপ্তারও করেছিল। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সরকারি বাধা, হামলার অভিযোগে দুটি মামলাও করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সে ঘটনার হুকুমদাতাকে শনাক্ত করা হয়নি। এগোয়নি সেই তদন্ত। হয়নি বিচার। কিছু দিনের ব্যবধানেই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের গোল চত্বরে ‘বাউল’ ভাস্কর্যে হামলা চালায় একই মৌলবাদী গোষ্ঠী। তাদের তোপের মুখে শেষে বিমানবন্দর এলাকা থেকে ভাস্কর্যটি সরিয়েই নেওয়া হয়।

২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে নৌবাহিনীর সদর দপ্তরের সামনে শিল্পী মৃণাল হকের ‘অতলান্তিকে বসতি’র  একটি অংশ ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় একটি জিডি করেছিলেন শিল্পী। পরে নৌবাহিনীর সহায়তা, তত্ত্বাবধায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ভাস্কর্যটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।

২০১৭ সালের ২৬ মার্চ রাতে বলাকা ভাস্কর্য ভাঙচুরকারী দলটিই সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে স্থাপিত ‘লেডি জাস্টিস’ ভাস্কর্যটি ভাঙতে যায়। শেষে এই ভাস্কর্যটিও সরাতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। চলতি বছর ২২ আগস্ট মৃত্যুবরণ করা ভাস্কর মৃণাল হক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘একই চক্র বলাকা ও লালনের ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে। তাদের কারণেই ভাস্কর্য সরাতে হয়েছে। এদের এখনই দমন না করলে আরো অনেক মূল্য দিতে হবে।’ তিনি জানিয়েছিলেন,  শিশু একাডেমিতে স্থাপিত ‘দুরন্ত’ শিশু ভাস্কর্য, রাজধানীর গুলশান থানা এলাকার কাকলীসহ অনেক ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। ভাঙতে না পারলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে স্থাপিত স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অমর সৃষ্টি ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্যে হামলা হয়েছে অনেকবার।

আমাদের শাজাহানপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার বনানী চত্বরের স্বাধীনতার ভাস্কর্য তিন দফা ভাঙচুরের ঘটনার তদন্ত হয়নি। শাজাহানপুর থানার ওসি আজিম উদ্দীন দাবি করেন, সর্বশেষ অভিযোগে উল্লেখ করা ছিল অজ্ঞাতনামা যানবাহনের ধাক্কায় ভাস্কর্যটি ভেঙে গেছে। তাই পরবর্তী সময়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, ২০০৩ সালে সাতমাথা গোলচত্বর থেকে বনানী গোলচত্বরে ভাস্কর্যটি প্রতিস্থাপন করা হয়। পরে ২০১৬ ও ২০১৮ সালে দুই দফা ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৬ জুন রাতে ভাঙচুরের ঘটনায় শাজাহানপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

অন্যদিকে সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় চারটি ভাস্কর্য ভাঙচুর করার ঘটনায় মামলা পুলিশ চার্জশিট দিলেও হয়নি বিচার। গত ১৪ মে গভীর রাতে সরিষাবাড়ী কলেজ মাঠে পৌরসভার উদ্যোগে নির্মিত চারটি ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খেলার মাঠের নিরাপত্তা প্রহরী ফরিদুল ইসলামকে আটক করলেও পরে তাঁকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। ১৫ মে পৌরসভার কাউন্সিলর জহুরুল ইসলাম তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। সরিষাবাড়ী পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোহাম্মদ আলী  জানান, দল থেকে বহিষ্কার হওয়া মেয়র রুকুনুজ্জামান রোকন ও তাঁর সমর্থকরা এসব ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে! কারণ মেয়রকে অনাস্থা দেওয়ার পর থেকেই তিনি কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন।  সরিষাবাড়ী থানার ওসি আবু মো. ফজলুল করীম বলেন, ঘটনা তদন্ত করে তিনজনকে দোষী করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY