ক্যাসেটের মৃত্যু

0
132

অন্তত নব্বই-এর দশকের প্রজন্ম ছাড়া ফিতার ক্যাসেটের গভীর মর্ম আর কে বুঝবে? যারা ক্যাসেট বোঝে, তারা সেলিমপ খানকে চেনে না এমনটা হতেই পারে না। সঙ্গীতা দেশের একটি শীর্ষ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, যার সেলুলয়েডের ফিতায় দেশের বিখ্যাত বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী উঠে এসেছে। নব্বইয়ের দশকে সঙ্গীতাকে থেকে প্রকাশিত অ্যালবামের ওপরে বড় করে লেখা থাকতো ‘সেলিম খান প্রেজেন্টস।’ নগরবাউলের দুষ্টু ছেলের দল অ্যালবামটা তুমুল হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। সবাই গাইছে, মাথা দোলাচ্ছে। ‘ট্রেন্ড’ হয়ে গেল ও্যালবামের গানগুলো। আমার ভাই কিনে এনেছে। আমিও নেড়েচেড়ে দেখি। সেলিম খান প্রেজেন্টস, দুষ্টু ছেলের দল।

একবার নিজের জমানো টাকা দিয়ে হাসানের তিন সত্যি অ্যালবামটা কিনেছি। সারাদিন রাত ক্যাসেটে ‘নয় রে নয় মিথ্যে নয় রে প্রহসন’ শুনছি। ক্যাসেট ফুরিয়ে গেলে ফের উল্টোদিক করে দিয়ে বিপরীত দিকের গান শুনছি। চ্চলছে তো চলছেই…  আজ একটা গান হিট হতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়ে। তখন একটা গান হিট হলেই মানুষজন ক্যাসেট কিনতো। এরপরে সমস্ত গান এমনিতেই শোনা হয়ে যেত। সব গান আপনা আপনি পছন্দের তালিকায় উঠে আসতো।

একদিন শুনলাম পার্বতীপুরে হাসান আসছেন। ‘তিন সত্যি’ অ্যালবামটাই বাসার ক্যাসেটের তাক থেকে নিয়ে নিয়েছি। ওভাবেই দৌঁড়। পার্বতীপুর জংশনের এক নম্বর প্ল্যাটফরম দিয়ে হেঁটে আসছেন হাসান। আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না। খুব সাদামাটা হয় কিভাবে একজন শিল্পী? শুধু চুলটাই বড়। দুই নম্বর প্ল্যাটফরম পেরোলেন, এরপর তিন, নম্বর, চার নম্বর, পাঁচ নম্বর… এরপরে ইয়ংস্টার ক্লাবে এসে ঢুকলেন।

আমি ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে বারবার দেখছি। একটা অটোগ্রাফ নিতে হবে। হাতে নিয়ে আরেকবার দেখে নিলাম। হাসান হাতে একটা দাবা নিয়ে আছেন, তার মাথার ডানে সঙ্গীতার লোগো। বামে ওপরে, সেলিম খান প্রেজেন্টস। কে এই সেলিম খান। ক্যাসেট এতোবার দেখেছি যে সেদিন প্রশ্নটা জেগেছিল। এর আগে এতোবার সেলিম খানের নাম দেখেছি কিন্তু সেদিনই প্রশ্নটা জেগেছিল জোড়ালো ভাবে। কারণ অপেক্ষা করছিলাম, অপেক্ষার সময়টা ক্যাসেটটা নেড়েচেরে সুক্ষ্মভাবেই হয়তো খেয়াল করছিলাম।

যাই হোক, হাসান একটা সময় ডাকলেন। ক্যাসেট বাড়িয়ে দিলাম। বললেন, কোন গান ভালো লেগেছে, আমি বললাম সবগুলো… হ্যাসান অটোগ্রাফ দিলেন। আমি সেলিম খান প্রেজেন্টস অটোগ্রাফ সমেত তিন সত্যি অ্যালবামটা নিয়ে এলাম। কয়েকদিন পরে সেই অ্যালবামটা চুরি হয়ে যায় কিভাবে যেন। সেই কষ্টের কথা বলার মতো না।

সেলিম খান গত শুক্রবার ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। পেশাগত কারণেই তাঁর ভাই রবিনের সঙ্গে কাল দুপুরে কথা হয়েছিল। জানিয়েছিলেন সামান্য ঠাণ্ডা লেগেছিল। এরপরে ইমপালস হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। সেখানে করোনা শনাক্ত হন। এরপর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে নিয়ে আসা হয় ইউনাইটেড হাসপাতালে। এই হাসপাতালে আইসিইউতে ছিলেন। কাল দুপুর বারোটায় নেয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। আর ফেরেননি সেলিম খান। আজ চলে গেলেন সেলিম খান। হয়তো সঙ্গীতা টিকে থাকবে, তবে সমাপ্ত হলো সেলিম খান প্রেজেন্টস…

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY