উগ্রবাদীদের ফেরাতে র‌্যাবে বিশেষ টিম

0
87
উগ্রবাদীদের ফেরাতে র‌্যাবে বিশেষ টিম
উগ্রবাদীদের ফেরাতে র‌্যাবে বিশেষ টিম

ধর্মকে ব্যবহার করে উগ্রবাদীরা সাম্প্রদায়িক ফাটল সৃষ্টি করে জঙ্গিবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। এদের ডি-রেডিক্যালাইজেশনে (কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা) নতুন কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। র‌্যাব সদর দফতর এবং ব্যাটালিয়ন সদর দফতরগুলোতে এ নিয়ে বিশেষ টিম (দল) গঠন করা হয়েছে। জেলা পর্যায়েও এ টিম সম্প্রসারণ করা হবে। এতে শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় নেতাসহ সমাজের নানা স্তরের লোকদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। টিমের সদস্যরা এ মুহূর্তে বেশ কয়েকজন উগ্রবাদীকে নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি রোববার বিকালে টেলিফোনে কথা বলেন। এছাড়া এদিন দুপুরে এ বিষয়ে র‌্যাব সদর দফতরে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।

র‌্যাবের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে সাত জঙ্গিকে ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারা হলেন- বগুড়ার আব্দুল হাকিম, গাইবান্ধার মাহামুদুল হাসান ওরফে বিজয়, দিনাজপুরের হাফেজ মাসুদ রানা ওরফে হাফেজ মাসুদ, হাফিজুর রহমান, আক্তারুজ্জামান ওরফে আক্তারুল, রাজশাহীর সালাউদ্দীন আহম্মেদ ওরফে সুজন ও কুষ্টিয়ার মোর্শেদ শরীফ হাসান ওরফে কল্লোল। এদের মধ্যে ২০১৭ সালের ৫ মার্চ কল্লোল এবং বাকিরা ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তারা সবাই এখন ভালো আছেন।

কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, সম্প্রতি আমরা দুই ধরনের উগ্রপন্থী দেখছি। কিছু উগ্রপন্থী উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী হলেও তারা কোনো সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিচ্ছে না। আবার কিছু উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিচ্ছে। তিনি বলেন, উগ্রবাদীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে ডি-রেডিক্যালাইজেশনের বিকল্প নেই। শুধু আইনের আওতায় এনেই জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব নয়। কারণ, জেল খেটে বের হওয়ার পরও তারা উগ্রপন্থায় জড়িত হতে পারে। জেলের ভেতরও উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দিতে পারে। তাই কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গি বা উগ্রবাদীদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আশা করছি নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে পারব।

তিনি আরও বলেন, কোনো উগ্রবাদী প্রথমেই জঙ্গি হয় না। পর্যায়ক্রমে তারা জঙ্গি হয়। এক্ষেত্রে পাঁচটি ধাপ আছে। প্রথমে উগ্রবাদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে এবং দ্বিতীয়ত উগ্রবাদকে সমর্থন করে। এরপর অ্যাকটিভিস্ট হয় (দাওয়াত দেয়া ও চাঁদা আদায়সহ নানা কাজে অংশগ্রহণ)। চতুর্থ ধাপে স্বাভাবিক সবকিছু বিসর্জন দিয়ে এস্ট্রিম (চরম) পর্যায়ে যায়। এরপর বায়াত গ্রহণের পর টেরোরিস্ট হয়ে যায়। এ পর্যায়ে চরমপন্থাকে বাস্তবায়ন করতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে যোগ দেয়।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, যারা উগ্রবাদীর প্রথম পর্যায়ে আছে তাদের নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। সমাজে তাদের পুনর্বাসনের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ চলছে। পুনর্বাসনের পর তাদের নিবিড় মনিটরিংয়ে রাখা হবে। যাদের নিয়ে পুনর্বাসনের কাজ চলছে তারা কীভাবে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করল- জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমে তাদের ভয় দেখানো হয়। তাদের স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটানো হয়। তারপর অসমর্থ করে তোলা হয়। এ পর্যায়ে সে তার কোনো অপতৎপরতা করতে পারে না। জঙ্গি নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার সক্ষমতা নষ্ট করার পর ‘ডিজ-এনগেজড’ করা হয়। তাকে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ধরে এনে তার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপরই ডি-রেডিক্যালাইজেশনে যুক্ত হয় র‌্যাব। এ পর্যায়ে তার মগজ থেকে চরমপন্থা দূর করতে নানা পন্থা অবলম্বন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, যারা চরমপন্থার দিকে ধাবিত হয়, তাদের মধ্যে অনেক বিভক্তি থাকে। গ্রেফতারের পর অনেকে নিজেদের হতাশার কথা জানিয়ে স্বাভাবিক জীবনে আসতে চায়। যাদের আমরা ডি- রেডিক্যালাইজেশনের মাধ্যমে সমাজে পুনর্বাসিত করতে পারব তাদেরকে দিয়ে অন্যদের বোঝানোর চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানান।

এক প্রশ্নের উত্তরে কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, করোনা পরিস্থিতে জঙ্গিদের কার্যক্রম থেমে নেই, বরং অবসর সময়ে ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের সামনে একটু বেশি সময় বসে থাকার সুযোগ পাচ্ছে তারা। এ সুযোগটা তারা কাজে লাগাচ্ছে। অনলাইনে তাদের কার্যক্রম বেড়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক মতানৈক্য আগেও ছিল। বিভিন্ন সময়ে কিছু সমস্যা হলেও এ মতানৈক্য দূর হয়েছে। আগে সাম্প্রদায়িকতাকে কেন্দ্র করে জঙ্গিবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা ছিল না। কিন্তু এখন এটা চলছে। সাম্প্রদায়িক মানুষ অনেক আছে। কিন্তু সবাই টেরোরিস্ট নয়। যারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে তারাই টেরোরিস্ট। সাম্প্রদায়িকতার ভেতর থেকে উসকানি দিয়ে সন্ত্রাসী কাজে যোগদানের যে প্রচেষ্টা চলছে এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান রয়েছে আমাদের।

কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, ওয়াজ মাহফিলে অনেকে কোরআন-হাদিস অনুযায়ী কথা না বলে নিজেদের স্টাইলে কথা বলেন। তারা ধর্মের ক্ষতি করেন। এ কারণেই সরকার কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারায় নিয়ে এসেছে। যারা ধর্মকে গালি দেয় তারাও এক ধরনের চরমপন্থী।

তিনি বলেন, এর আগে সাত জঙ্গি র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারা সবাই এখন ভালো আছে। এ বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখন আমরা এডহক ভিত্তিতে ডি-রেডিক্যালাইজেশন টিম গঠন করেছি। পরে এটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করছি আমাদের এ প্রক্রিয়ায় এনজিও সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY