দিনভর অভিযান বগুড়া পুলিশের: জালে যমুনার ‘কুমির

0
84

জলে বিচরণ করতে করতে ‘কুমির’ হয়ে ওঠা সেই লুৎফর ডাকাতের ৩০ বছরের ত্রাসের অধ্যায়ে অবশেষে দাঁড়ি টেনেছে পুলিশ। তবে যমুনার জল থেকে তাঁকে তুলে আনা খুব একটা সহজ ছিল না। অভিযানে পুলিশকে করতে হয়েছে নাটকের মঞ্চায়ন। কখনো জেলে, কখনো কামলা (শ্রমিক) সেজে পুলিশ করেছে অভিনয়। আর তাতেই আটকা পড়েন দুর্ধর্ষ লুৎফর ডাকাত। গত সোমবার যমুনার দুর্গম চর বগুড়ার সারিয়াকান্দির চালুয়াবাড়ী গ্রাম থেকে তিনি অস্ত্রশস্ত্রসহ ধরা পড়েন।

এর আগে গত ২৫ অক্টোবর ‘যমুনার কুমির!’ শিরোনামে লুৎফর ডাকাতকে নিয়ে কালের কণ্ঠ’র প্রথম পাতায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তখন থেকেই টানা দুই মাস ওই সন্ত্রাসীকে ধরতে চলে একের পর এক অভিযান। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও নিজস্ব সোর্স ব্যবহার করে সব সময়ই পুলিশের চেয়ে দুই কদম এগিয়ে ছিলেন তিনি। এ কারণে প্রতিবারই অভিযানের পর শূন্য হাতে ফিরতে হয় পুলিশের আভিযানিক দলকে।

লুৎফর ছিলেন চালুয়াবাড়ী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। ২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সংগঠনবিরোধী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সারিয়াকান্দির যমুনা নদীর চর চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্বপারের বহুলাডাঙ্গা গ্রামের মুছা শেখের ছেলে এই লুৎফর। খুন, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক, অস্ত্র, লুটপাটসহ তাঁর মাথার ওপর ঝুলছে ১৬টি মামলা। এর মধ্যে পাঁচটি মামলায় তাঁর নামে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা পুলিশের সঙ্গে ‘মধুর সম্পর্ক’ থাকায় এত দিন গ্রেপ্তার এড়িয়ে নিরাপদে ছিলেন লুৎফর।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, ‘কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদনের পর থেকেই লুৎফর ডাকাতের গতিবিধির ওপর চোখ রাখছিলাম। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নিয়োগ করা শত শত সোর্সের কারণে প্রতিবারই হাত ফসকে বের হয়ে যেতেন তিনি। তাঁকে ধরতে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবের একাধিক দলও কাজ করছিল। কিন্তু সুচতুর লুৎফর সবাইকে বোকা বানিয়ে নদীপথের দুর্গম ক্যানেলগুলো দিয়ে চোখের পলকে পালিয়ে যেতেন।’

পুলিশ সুপার আরো জানান, লুৎফরকে ধরতে তিনিসহ বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী একটি বিশেষ দল গঠন করেন। ১৪ সদস্যের ওই দলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক দলের নেতৃত্বে ছিলেন ডিবির ইন্সপেক্টর ইমরান মাহমুদ তুহিন এবং অন্য দলের দায়িত্বে থাকে এসআই মজিবর রহমান ও জুলহাজের ওপর।

অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশের এক কর্তকর্তা জানান, সর্বশেষ এলাকা অনুসরণ (রেকি) করার সময়ও তাঁদের ছদ্মবেশ ছিল কামলার। মাথায় গামছা পেঁচিয়ে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরে তাঁরা ১২ জনের দল চলে যায় চালুয়াবাড়ী। সতর্কতা হিসেবে কামলার ছদ্মবেশে তাঁরা সারিয়াকান্দির কালীতলা এলাকার ঘাট বাদ রেখে আরো ১০ কিলোমিটার দূরে কুতুবপুরের ঘাট ব্যবহার করে নৌকায় চালুয়াবাড়ী চরে গিয়ে জমিতে দিনভর নিড়ানির কাজ করেন। ওই একই জমিতে কাজ করছিলেন লুৎফরের সোর্সও। অতিরিক্ত সতর্কতার পরও সে সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে যায় তারা।

এরপর গত সোমবার ভোরে ফের অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে নদীতে নামে পুলিশ। এবার ধুনটের একটি স্থান থেকে দুটি নৌকা নিয়ে ডিবির ১৪ সদস্যের দুটি দল রওনা দেয় সারিয়াকান্দির চালুয়াবাড়ীর দিকে। তখন তাদের ছদ্মবেশ ছিল জেলে। পুলিশের দলটি শীত ও কুয়াশা উপেক্ষা করে প্রায় চার ঘণ্টা নদীতে ঘুরতে ঘুরতে সকাল ১০টার দিকে চালুয়াবাড়ী চরে পৌঁছে। সেখানে একটি দল হাতে নিড়ানি নিয়ে জমিতে কাজ শুরু করে। অন্য দলটি ব্যাকআপ হিসেবে নদীতে থাকে জেলেবেশে জাল হাতে। পুলিশের দলটি ছদ্মবেশে থাকার সময়ও সাঙ্গপাঙ্গসহ সারা রাত নদীতে ডাকাতি শেষে সকাল ১১টার দিকে লুৎফর বাড়ি ফেরেন। পুলিশ আগে থেকেই জানত, দিনের এই সময় মাত্র এক ঘণ্টা অবস্থানের পর লুৎফর বাকি ২৩ ঘণ্টা নদীতে থাকেন। যমুনা নদীতে শত শত নৌকার মধ্যে বেশির ভাগই লুৎফর ডাকাতের সোর্সের। বাইরে থেকে যেকোনো মানুষের উপস্থিতি নজরে এলেই তারা মোবাইল ফোন কিংবা বিশেষ বার্তায় খবরটি জানিয়ে দেয়।

লুৎফরের সহযোগীরা সব সময় ব্যবহার করত অত্যাধুনিক অস্ত্র ও দ্রুতগতির নৌকা। পুলিশ গিয়ে কোনো সুবিধাই করতে পারত না। এসব তথ্য বিবেচনায় নিয়ে সোমবারের অভিযানে পুলিশ ছদ্মবেশে থাকলেও প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে রাখে। লুৎফর বাড়িতে ফিরলে পুলিশ কামলাবেশে বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে। ঠিক ওই সময়ই লুৎফরের এক সোর্স মাঠে কাজ করা অবস্থায়ই বিষয়টি টের পেয়ে ‘ওয়াও ওয়াও’ শব্দ করে দুই হাত নাড়াতে থাকে। তার এই শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই ধরনের শব্দ করতে থাকে গ্রামের বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ ও শিশুরা। এই শব্দে ঘরে থাকা লুৎফর বেরিয়ে বিশেষ নৌকা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

এ সময় সুযোগ বুঝে লুৎফরের সহযোগী ডাকাত সদস্য ও স্বজন নৌকা নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে লুৎফরের শয়নঘর থেকে দুই রাউন্ড গুলিসহ একটি ওয়ান শুটার পিস্তল উদ্ধার করে পুলিশ।

এরপর সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত নদীপথে একাধিক স্থানে লুৎফরের আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। কিন্তু তাঁর সহযোগী সবাই গা ঢাকা দেওয়ায় অন্য কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। গভীর রাতে বগুড়া ডিবি পুলিশের ওসি আব্দুর রাজ্জাকসহ অন্য সদস্যরা সারিয়াকান্দি গিয়ে বিশেষ নিরাপত্তায় লুৎফর ডাকাতকে বগুড়া ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, প্রতিদিন ৫০টি করে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করতেন লুৎফর। চরে জঙ্গি ও বিভিন্ন জেলার পেশাদার সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়দাতাও ছিলেন তিনি। নদীপথের ৫০০ কিলোমিটার এবং স্থলপথের ২০ জেলার মাদক বহন ও বিক্রির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত হতো তাঁর হাত ধরেই। একই সঙ্গে নদীপথে চলা প্রতিটি মালবাহী নৌকা থেকে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করত লুৎফর বাহিনী। এই টাকা বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা, জামালপুরের মাদারগঞ্জসহ বিভিন্ন থানার পুলিশ কর্মকর্তারা মাসোহারা পেতেন।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, ‘আমরা তাঁকে রিমান্ডে এনে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করব। আশা করছি, লুৎফরের মতো তাঁর দলের অন্য অপরাধীরাও পর্যায়ক্রমে ধরা পড়বে।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY