দেশি পেঁয়াজের রাজত্ব বাজারে

0
20

আমদানির চাপে অনেক বছর ধরেই বাজার হারাচ্ছিল দেশি পেঁয়াজ; মূলত আমদানীকৃত পেঁয়াজের দামের সঙ্গে দেশি পেঁয়াজের উৎপাদন খরচের বিশাল ফারাক থাকায় কোণঠাসা ছিল দেশি পেঁয়াজ। কৃষকরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন পেঁয়াজ চাষে। কিন্তু এবার উল্টো ঘটনা ঘটেছে। এই প্রথম বাজার দখল করে আধিপত্য বিস্তার করল দেশি পেঁয়াজ।

ভোগ্য পণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে এখন দেশি পেঁয়াজের ছড়াছড়ি। চট্টগ্রামের বাজারে এমনিতেই দেশি পেঁয়াজের চাহিদা ছিল খুবই কম। দুই মাস আগেও পাইকারি বাজারে অন্তত ১৫টি দেশের ভিন্ন স্বাদের পেঁয়াজে ভর্তি ছিল এসব আড়ত। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার পর এক মাস আগে সেসব পেঁয়াজকে হটিয়ে বাজার দখল করেছিল ভারতীয় পেঁয়াজ; সরকারের একটি সিদ্ধান্তে এখন সেই ভারতীয় পেঁয়াজকে হটিয়ে দিল দেশি পেঁয়াজ। পাইকারি ও খুচরা বাজারে এখন একচেটিয়া দেশি পেঁয়াজের রাজত্ব। যদিও এই রাজত্ব কত দিন স্থায়ী হবে তা নির্ভর করছে সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।

সেই সিদ্ধান্ত কী জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ আমদানিকারক মনজুর মোরশেদ বলছেন, প্রতিবছর বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের মৌসুমে ভারত সরকার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়। সেই পেঁয়াজ দেশে আসার পর বাংলাদেশি কৃষকরা উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করতে না পেরে পথে বসেন। দাম না পেয়ে পেঁয়াজ উৎপাদনে আগ্রহ হারান দেশি কৃষকরা। এবারও সেই ধারাবাহিকতা ছিল কিন্তু সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়া এবং পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানো নিশ্চিত করতে একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে।

তিনি বলছেন, এবার সরকার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিয়েছে ঠিকই কিন্তু শুল্ক আরোপ করেছে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবারই প্রথম ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক এবং ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এই শর্ত মেনে আমদানি করতে গিয়েই ভারত থেকে পেঁয়াজের আমদানিমূল্য বেশি পড়ছে। আর বাংলাদেশে উৎপাদিত পেঁঁয়াজের সঙ্গে ভারত থেকে আসা পেঁয়াজ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে।

আমদানি কমে যাওয়ার সত্যতা মিলে ভারত থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারকদের বক্তব্যে। তেমন একজন আমদানিকারক মেসার্স রায়হান ট্রেডার্সের মালিক শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, আমদানি হবে কিভাবে? ভারত থেকে পেঁয়াজ কেনা পড়ছে ৪০ টাকায়; পরিবহন খরচসহ ১০ শতাংশ শুল্ক যোগ করলে এর দাম পড়ে ৪৪ টাকা। দেশের বাজারে বিক্রি করতে হবে ৪৬/৪৭ টাকায়, কিন্তু বাজারে তো পেঁয়াজ এর চেয়ে দাম অনেক কম। আমদানি মূল্যের সঙ্গে বাজার মূল্যের ব্যবধান অনেক বেশি।

তিনি বলেন, ‘রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তোলার পর গত জানুয়ারি মাসে ভারত থেকে মাত্র ১৭৫ টন পেঁয়াজ এনেছিলাম; কেনা দাম না পেয়ে বিক্রি করতে গিয়ে আট লাখ টাকা লস করেছি। আমার মতো অনেকেই এখন আমদানি বন্ধ করে দিয়েছেন ভারত থেকে। ফলে লস দিয়ে এভাবে কত দিন কে ব্যবসা করবে?’

ভারতীয় পেঁয়াজ কমে আসার প্রমাণ মিলছে ভোগ্য পণ্যের দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে। সেখানে আড়তে সব দেশি পেঁয়াজ। কিছু আড়তে চট্টগ্রাম বন্দরে নিলামে বিক্রি হওয়া হল্যান্ড ও তুরস্কের পেঁয়াজ থাকলেও সেগুলো বিক্রি নেই বললেই চলে। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ আসছে পাবনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর থেকে। আড়তে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৮ থেকে ৩২ টাকা কেজি। আর নিলামে ওঠা হল্যান্ডের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৫ থেকে ১৮ টাকা কেজি।

খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ আড়তদার মোহাম্মদ ইদ্রিস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের বাজারে দেশি পেঁয়াজ আগে থেকেই বিক্রি হতো না। এই প্রথম দেশি পেঁয়াজের আধিপত্য দেখলাম। শেষ পর্যন্ত সরকার এমন সিদ্ধান্ত নেবে আমরা ভাবতেই পারিনি। যেকোনো দেশ থেকেই আমদানি করলে আমরা কমিশন পাই, লাভবান হই এটা ঠিক। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত দেশের পক্ষে, কৃষকদের পক্ষে। সব সময় এমন সিদ্ধান্ত অটুট থাকুক।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY