করোনা পরবর্তী জটিলতায় চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল!

0
74
করোনা পরবর্তী জটিলতায় চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল

দেশে করোনা থেকে সুস্থ হওয়া রোগীদের নানা ধরনের শারীরিক (পোস্ট কোভিড জটিলতা) সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অনেকে ফলোআপ চিকিৎসার জন্য পুনরায় হাসপাতালে ছুটে আসছেন। তাদের সেবা দিতে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রত্যেক হাসপাতালে পোস্ট কোভিড ক্লিনিক বা সেন্টার চালুর নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ হাসপাতালে এই সেবা কাঠামো না থাকায় বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে চলা করোনা মহামারিতে এ পর্যন্ত ১৯ লাখ ১৯ হাজার ১০২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭ লাখ তিন হাজার ৩০৯ জন সুস্থ হয়েছেন। অনেকে একাধিকবার আক্রান্ত হয়ে আবার সুস্থ হয়েছেন। তবে ভাইরাসটি মুক্ত হলেও কোমরবিডিতে (দীর্ঘ মেয়াদে বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত) ভোগা ব্যক্তিদের পুনরায় শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু সব হাসপাতালে পোস্ট কোভিড ক্লিনিক না থাকায় রোগীরা বিপাকে পড়ছেন।

এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. ফরিদ উদ্দিন মিয়া বলেন, করোনা-পরবর্তী পোস্ট কোভিড ক্লিনিক ওইভাবে চালু নেই। তবে যেসব হাসপাতালে কোভিড-১৯ ইউনিট আছে, যেমন : মেডিকেল কলেজ, কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে একটি পোস্ট কোভিড ওয়ার্ড বা সেন্টার চালুর করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা আছে। যাতে করে কেউ পোস্ট কোভিড কমপ্লিকেশন নিয়ে এলে সেবা নিশ্চিত করা যায়। এটি সব কোভিড হাসপাতালেই থাকার কথা। এর পরও কেউ না খুললে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পুনরায় চিঠি দেব। কোনো রোগী যাতে ফিরে না যায় সে ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, করোনা-পরবর্তী জটিলতা যে কারওই হতে পারে। কারণ সংক্রামক রোগটি সহজে পিছু ছাড়ে না। তবে যাদের কোমরবিডি অর্থাৎ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, লিভার, স্ট্রোক ও হার্ট সমস্যা রয়েছে; কেমো বা রেডিও থেরাপি নিয়েছে বা নিচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে ভয়ংকর হতে পারে। ফলে করোনা থেকে সুস্থ হলেও অন্তত এক বছর নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকা উচিত। সব হাসপাতালে পোস্ট কোভিড সেবা ক্লিনিক থাকা উচিত।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, করোনায় আক্রান্ত হলে শরীরের কোষগুলো অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারও কারও ফুসফুস ৭০ থেকে ৮০ ভাগ সংক্রমিত হতে পারে। যার যত বেশি হবে ততটাই জটিলতা থাকবে। যেটি তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও স্থায়ীভাবে হতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির নাকের গন্ধ ও মুখের স্বাদ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে পারে।

সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে কয়েকজন রোগীর স্বজনের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয়, যারা করোনা-পরবর্তী জটিলতায় চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তাদের মধ্যে কায়েস আহমেদ নামে এক ব্যক্তি বলেন, গত নভেম্বরে তার মা করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। এখন হঠাৎ কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় ঢামেকে নিয়ে এসেছেন। গেটের সাঁটানো সাইনবোর্ডে ‘পোস্ট কোভিড ক্লিনিক’ লেখা দেখে চারতলায় যান। কিন্তু সেখানে খুঁজে পাননি। তার মতো আরও কয়েকজন রোগী ও স্বজন ক্লিনিকটি খুঁজছিলেন। পরে হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ক্লিনিকটি ভবন-২ এর পঞ্চমতলায় অবস্থিত। একজন চিকিৎসকের পরামর্শে ৫৪৫ নম্বরে গেলে অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওআর্থ্রাইটিস ক্লিনিক লেখা সাইনবোর্ড সংবলিত কক্ষটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। পাশের ওয়ার্ডের নার্সিং ইনচার্জ সুলতানা আক্তার জানান, প্রতি রোব ও বুধবার এখানে পোস্ট কোভিড ফলোআপে আসা ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ক্লিনিকটির চিকিৎসক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মাদ মাহফুজুল হক বলেন, করোনা-পরবর্তী জটিলতায় ভোগা ব্যক্তিদের চিকিৎসায় মেডিসিন বিভাগে একটি পোস্ট কোভিড ক্লিনিক চালু করা হয়েছে। সপ্তাহের দুদিন রোগীদের চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এখানে আগতদের মধ্যে অবসন্নতায় ভোগা রোগী বেশি আসছে। এ ছাড়া রোগীরা সামান্য পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট সমস্যার কথা বলছে। যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট ও হার্টে সমস্যা রয়েছে, করোনা সেরে গেলেও এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে না আসার অভিযোগ করছে। অনেকে মাথাব্যথা, শরীরে হালকা ব্যথা, মনোযোগ ঘাটতি ও ওজন কমার কথা বলছে। ফলে হতাশা, উদ্বিগ্নতা ও বিষণ্নতা বাড়ছে। তবে কোনো রোগীই সিভিয়ার কন্ডিশন বা মারাত্মক উপসর্গের কথা বলেননি।

তিনি বলেন, করোনার কারণে ২০২০ সালের জুলাই মাসের দিকে ক্লিনিকটি চালু হয়, তখন রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। সে তুলনায় এখন কমসংখ্যক রোগী আসছে। এখন গড়ে দৈনিক ১০ জনের মতো রোগী আসছে। ঢাকা মেডিকেলে করোনা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়া রোগীরা ফলোআপের জন্য আসছে। ক্লিনিকটি চালুর পর এ পর্যন্ত প্রায় পৌনে দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের কোভিড ইউনিটের মেডিকেল অফিসার ডা. মারুফা রহমান বলেন, তাদের হাসপাতালে এমন রোগীও আসছে, যারা একাধিকবার করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। ভাইরাসটি থেকে সুস্থতা-পরবর্তীতে শ্বাসকষ্টে সমস্যা নিয়ে বারবার আসছেন। এমন কয়েকজনের ৬০ শতাংশের মতো ফুসফুসে ফ্রাইবোসিস সমস্যা দেখা গেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ে কোভিড আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ রোগী ফলোআপে আসছে।

এদিকে দেশে করোনা-পরবর্তী জটিলতায় কী পরিমাণ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে সেই তালিকা সরকারের হাতে নেই। আর কোন কোন জটিলতায় প্রাণহানি ঘটছে তা নিয়েও কোনো গবেষণা হয়নি। তবে করোনাকালে কী ধরনের অসুস্থতা নিয়ে মানুষ হাসপাতালে এসেছেন, তা বুঝতে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল একটি জরিপ পরিচালনা করে। গত বছরের ডিসেম্বরে পরিচালিত জরিপটির শিরোনাম ছিল ‘করোনাকালে তৃতীয় ধাপের মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের মানসিক অসুস্থতার ধরন’। ওই জরিপে দেখা যায় ৩৩ শতাংশ রোগীর করোনা সম্পর্কিত দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ ছিল। তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভাইরাসটিতে ক্ষতিগ্রস্ত। উদ্বেগ ও বিষণ্নতাজিনত অসুস্থতায় ভোগা মানুষের হার ছিল প্রায় ১১ শতাংশ। করোনা সম্পর্কিত নয় এমন উদ্বেগজনিত অসুস্থতার হার প্রায় ১৯ শতাংশ।

অন্যদিকে সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর গবেষণা বলছে, করোনামুক্ত হওয়ার তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত আক্রান্তের শরীরে করোনা-পরবর্তী নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, সেরে ওঠার এক বছর পরও ৪৫ শতাংশের শরীরে এ ধরনের উপসর্গ দেখা গেছে। এতে আরও বলা হয়, যারা উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ নানা অসংক্রামক রোগে ভুগছেন, তাদের করোনা-পরবর্তী উপসর্গের আশঙ্কা ২ থেকে ৩ গুণ পর্যন্ত বেশি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY