স্ত্রীকে মারতে খুনি ভাড়া করেন বাবুল আক্তার

0
110
স্ত্রীকে মারতে খুনি ভাড়া করেন বাবুল আক্তার

স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার মামলায় স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকেই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এবং অর্থ যোগানদাতা হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন।

স্ত্রীকে হত্যার জন্য তিন লাখ টাকায় ‘খুনি’ ভাড়া করার বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এছাড়া বাবুলের সোর্স মুসাকে কিলিং মিশনের প্রধান এবং মোট সাতজনকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

তদন্তে প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রীকে খুনের জন্য বাবুল আক্তার ৩ লাখ টাকায় ‘খুনি’ ভাড়া করেন। এতে নেতৃত্ব দেন তার সোর্স মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা। সঙ্গে ছিল এহতেশামুল হক প্রকাশ হানিফুল হক প্রকাশ ভোলাইয়া, মো. মোতালেব মিয়া ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খাইরুল ইসলাম কালু ও শাহজাহান মিয়া।

২০১৬ সালের ৫ জুন ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে গিয়ে নগরীর জিইসি মোড়ে আততায়ীদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন মিতু। এ ঘটনায় স্বামী তৎকালীন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। কিন্তু এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে বাবুলেরই সম্পৃক্ততা মিলেছে তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদনে।

পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, বাবুল আক্তার তার স্ত্রীকে হত্যায় নিজের সোর্স মুসাকে নিয়োগের প্রমাণ মিলেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে ভাড়াটে খুনী নিয়োগে মূল অর্থ যোগানদাতাও ছিলেন বাবুল নিজেই।

হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে বিদেশী এনজিও কর্মী গায়ত্রী অমর শিং এর সাথে সম্পর্কে জড়ান বাবুল। এ নিয়ে বিরোধের জেরে স্ত্রী মিতুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বাবুল।

খুব দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তারা।

আদালতের আদেশে পরে মিতু হত্যা মামলা যায় পিবিআইয়ের হাতে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় পাঁচ বছরের মাথায় গত ১১ মে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চট্টগ্রাম পিবিআই কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। এর পরদিন ১২ মে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, মিতু হত্যার সঙ্গে তার স্বামী বাবুল আক্তারের ‘সম্পৃক্ততার প্রমাণ’ পেয়েছেন তারা। সেদিনই চট্টগ্রামে আদালতের প্রসিকিউশন শাখায় ৫৭৫ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন পিবিআইর পরিদর্শক মামলার তৎকালীন আইও সন্তোষ কুমার চাকমা। এরপর ওইদিনই পাঁচলাইশ থানায় মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন একটি হত্যা মামলা করেন। সর্বশেষ পিবিআই পরিদর্শক আবু জাফর মোহাম্মদ ওমর ফারুক দায়িত্ব নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করেন।

মামলায় সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন উল্লেখ করেন, কক্সবাজার জেলায় চাকরি করার সময় বাবুল আক্তারের সঙ্গে ইউএনএইচসিআরে ফিল্ড অফিসার (প্রোটেকশন) পদে কর্মরত ভারতীয় নারী গায়ত্রী অমর সিংয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার প্রতিবাদ করায় মিতুকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে পরের বছরের জুন পর্যন্ত সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত ছিলেন বাবুল। তখন তার মোবাইল ফোন চট্টগ্রামের বাসায় রেখে গিয়েছিলেন। ওই ফোনে গায়ত্রীর পাঠানো ২৯টি এসএমএস মিতু দেখে সেগুলো তার একটি খাতায় লিখে রেখেছিলেন।

এতে আরও বলা হয়, ‘হত্যাকাণ্ডের এক মাস আগে বাবুল চীনে এক প্রশিক্ষণে গেলে স্ত্রী মিতু দুটি বই পান, সেগুলো ওই নারী বাবুলকে দিয়েছিল। বই দুটির দুটি পাতায় ওই নারী ও বাবুলের লেখায় তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ মিলেছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উভয়ের মধ্যে পারিবারিক অশান্তি চরমে পৌঁছেছিল। নির্যাতনের বিষয়টি মিতু তাকেও জানিয়েছিল’।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনেও এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘তদন্ত প্রায় শেষ হয়েছে। প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে আরও কয়েকদিন লাগতে পারে’।

হত্যাকাণ্ডে যুক্ত নূরন্নবী এবং রাশেদ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। পলাতক দেখানো হয়েছে মুসা এবং কালুকে। আর বাবুলসহ পাঁচজন আছেন কারাগারে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক আবু জাফর মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, মিতু হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের সাক্ষ্যস্মারক রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মহানগর পিপি মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা গেছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY